সোমবার ২৪ জানুয়ারি ২০২২, মাঘ ১১ ১৪২৮, ২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ইসলাম

উসূলে তাফসীর ও উলূমুল কুরআন

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

 প্রকাশিত: ০৭:৫৮, ১০ জানুয়ারি ২০২২

উসূলে তাফসীর ও উলূমুল কুরআন

‘উসূলে তাফসীর’ ও ‘উলূমুল কুরআন’। এ দুটি শব্দ অনেকের কাছে পরিচিত। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, এগুলো একই শাস্ত্রের দুই নাম। এই ধারণাকে সঠিক বলা কিছুটা মুশকিল। কোনো সন্দেহ নেই, এই দুইয়ের সম্পর্ক অনেক বিস্তৃত ও গভীর। তবে এগুলোকে একই বিষয়ের দুই নাম মনে করা ঠিক নয়।

মূলত ‘উলূমুল কুরআন’ শব্দটি অনেক ইলম ও অনেক শাস্ত্রের সমষ্টি। মৌলিকভাবে এর দুইটি প্রকার-

প্রথম প্রকার :

العلوم التي في القرآن.

এর দ্বারা ওইসকল ইলম, স্পষ্ট নিদর্শন, বিধিবিধান, হেকমত ও জ্ঞান-ভাণ্ডার উদ্দেশ্য, যেগুলো কুরআনে স্পষ্টভাবে বা ইঙ্গিতরূপে উল্লেখিত হয়েছে। এগুলোর বিশ্লেষণের দায়িত্ব উম্মাহ্র সকল অঙ্গনের ইমামগণের এবং কিতাব ও সুন্নাহ্য় পারদর্শী সকল ফকীহ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও অন্যান্য আহলে ইলমের। এগুলো দ্বীন-শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত কিতাবাদিতে উল্লেখিত আছে। তাফসীরের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাদিতে এর বড় একটি অংশ বিদ্যমান রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকার :

العلوم المُوصِلة إلى القرآن وعلومه.

অর্থাৎ কুরআন পড়া, কুরআন শেখা ও শেখানো এবং কুরআনের মাঝে যেসমস্ত নির্দেশনা, বিধিবিধান ও জ্ঞান-ভাণ্ডার রয়েছে সেগুলো অনুধাবন করার জন্য যেসকল ইলম ও ফনের প্রয়োজন হয় সেগুলো।

পরিভাষায় এই প্রকারটিই ‘উলূমুল কুরআন’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। আর প্রথম প্রকারটি ‘আহকামুল কুরআন’, ‘হিদায়াতুল কুরআন’ ইত্যাদি নামে অধিক পরিচিতি লাভ করেছে।

দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত ইলম ও ফনের সংখ্যা একশ’র বেশি। সেগুলোর নাম ও পরিচয় অনেক আলেম তাদের বিভিন্ন কিতাবে পেশ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হল বদরুদ্দীন যারকাশী (৭৯৪ হি.) রাহ.-এর কিতাব ‘আলবুরহান ফি উলূমিল কুরআন’ এবং জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৯১১ হি.) রাহ.-এর ‘আলইতকান ফি উলূমিল কুরআন’।

শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আকীলা (১১৫০ হি.) সুয়ূতী রাহ.-এর কিতাবের উপর আরো কাজ করেছেন। কিছু ফনের বিষয়ে অতিরিক্ত কথা যুক্ত করেছেন এবং এমন কিছু ফন  যোগ করেছেন, যেগুলোর আলোচনা ‘আলইতকান’-এ আসেনি। তাঁর কিতাবের নাম-

الزيادة والإحسان في علوم القرآن.

এটি দশ খণ্ডে ছেপেছে।

উলূমুল কুরআনের শুধু পাঁচটি শাখা নিয়ে সামীন (السمين) হালাবী (৭৫৬ হি.) লিখেছেন-

الدُّرُّ المَصُون في علوم الكتاب المَكنون.

-নামে কয়েক খণ্ডের বিশাল কলেবরের কিতাব। এতে তিনি সূরা ফাতেহা থেকে সূরা নাস পর্যন্ত পুরো কুরআন কারীমে এই পাঁচ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

উলূমুল কুরআন বিষয়ে রচনার ধারা এখনো অব্যাহত আছে। শায়েখ তাহের জাযায়েরী (১৩৩৮ হি.)-এর-

التبيان لبعض المباحث المتعلقة بالقرآن على طريق الإتقان.

-কিতাবটি তো শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. নিজের তাহকীক-তালীকসহ প্রকাশ করেছেন। ড. ফযল হাসান আব্বাস (১৩৫০ হি.-১৪৩২ হি.) রাহ.-এর কিতাব-

إتقان البرهان في علوم القرآن.

দুই খণ্ডে দারুন নাফায়েস, জর্দান থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

যাইহোক এসকল উলূম ও ফুনূনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফন أصول التفسير বা قواعد التفسير। অবশ্য এটি আপন জায়গায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাপক, গভীর ও নাজুক একটি ফন। এর অনেক শাখা-প্রশাখা। সেসবের অনেকগুলো এমন, যেগুলোর বিষয়ে উলূমুল কুরআনের কিতাবে আলাদা আলাদা ফন হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।

উসূলুত তাফসীরে ওই সকল উসূল ও কাওয়ায়েদ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, যেগুলো অনুসরণ করে মুফাসসিরগণ কুরআনে কারীমের তাফসীর পেশ করে থাকেন। তেমনিভাবে এ ধরনের কিতাবে এমন অনেক বিষয় আলোচনা করা হয়, যেগুলো একজন আলেমের কুরআন অনুধাবন করতে সহায়ক হয় এবং যেগুলো তাফসীরের কিতাবসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার সময় লক্ষ রাখা জরুরি।

উসূলে তাফসীর বিষয়ে আলহামদু লিল্লাহ স্বতন্ত্র অনেক কিতাব লেখা হয়ে গেছে। তবে উসূলে তাফসীরের আলোচনা কেবল এই শিরোনামের কিতাবসমূহে সীমিত নয়। এর অনেক আলোচনা উলূমুল কুরআন, উসূলুল ফিকহ, উসূলুল হাদীস, কুতুবুত তাফসীর, শুরূহুল হাদীস, আহকামুল কুরআন, ফিকহে মুদাল্লালসহ অন্যান্য উলূম ও ফুনূনের কিতাবাদিতেও বিদ্যমান আছে। তবু আমরা এখানে উসূলে তাফসীর বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে লিখিত কিছু কিতাবের নাম উল্লেখ করা মুনাসিব মনে করছি। যেমন :

১. قواعد التفسير، فخر الدين ابن الخطيب (৫৪৬هـ৬২১-هـ)

২. المنهج القويم في قواعد تتعلق بالقرآن الكريم، شمس الدين ابن الصائغ الحنفي (৭৭৭هـ)

এই দুই কিতাবের পাণ্ডুলিপি কোথায় আছে আমার জানা নেই। তবে এগুলোর আলোচনা আলহামদু লিল্লাহ অন্যান্য কিতাবে আবশ্যই আছে।

৩. مقدمة تفسير ابن كثير، الإمام ابن كثير الدمشقي (৭০১هـ- ৭৭৪هـ)

৪. الفوز الكبير في أصول التفسير، الشاه ولي الله الدهلوي (১১৭৪هـ)

(كتاب نافع جدا في بيان أمور تعين في فهم القرآن الكريم)

৫. القواعد الحسان لتفسير القرآن، عبد الرحمن بن ناصر السعدي (১৩৭৬هـ)

৭. الاتجاهات المنحرفة في التفسير، الدكتور محمد حسين الذهبي (১৯১৫م১৯৭৭-م)

এই কিতাব আমি দেখিনি। তবে এর হাওয়ালা পেয়েছি শায়েখ খালেদ আবদুর রহমান (১৪২০ হি.)-এর কিতাব ‘উসূলুত তাফসীর ওয়া কাওয়াইদুহু’-এর মধ্যে।

৮. اتجاهات التفسير ومناهج المفسرين في العصر الحديث، الدكتور فضل حسن عباس.

৯. يتيمة البيان في شيء من علوم القرآن، العلامة محمد يوسف البنوري (১৩২৬هـ১৩৯৭-هـ)

১০. علوم القرآن، شيخ الإسلام حضرت مولانا  مفتي محمد تقي العثماني دامت بركاتهم.

শেষোক্ত কিতাবটির নাম উলূমুল কুরআন হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে আমি তা উসূলে তাফসীরের কিতাবসমূহের মধ্যে উল্লেখ করেছি।

সমকালীন আলেমগণের মধ্যে শায়েখ খালেদ ইবনে উসমান আসসাবত-

قواعد التفسير : جمعا ودراسة.

-নামে দুই খণ্ডে একটি কিতাব রচনা করেছেন। এতে জমা করার কাজ তো মাশাআল্লাহ সামগ্রিকভাবে ভালো হয়েছে; তবে তাহকীক ও তানকীহের অভাব আছে। বিশেষত মুতাশাবিহ সংক্রান্ত আলোচনায় অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে।

আজকাল এই মসিবত ব্যাপক হয়ে গেছে যে, কুরআন বোঝার নিআমত থেকে বঞ্চিত হয়েও মানুষ মুফাসসির হয়ে যায়। কিছু লোককে দেখা যায়, তারা উসূলে তাফসীরের আলোচনা এমনভাবে করে, যেন কিছু মূলনীতি মুখস্থ করে নিলেই তারা মুফাসসির হয়ে যাবে!!

সম্মানিত পাঠকগণের প্রতি অনুরোধ, তারা আলকাউসারের বিশেষ সংখ্যা ‘কুরআনুল কারীম’ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধসমূহ অবশ্যই পড়বেন। এটা অত্যন্ত জরুরি যে, প্রত্যেকে নিজের সীমার ভেতরে থেকে তাদাব্বুরে কুরআনের দায়িত্ব আদায় করবেন। সীমা অতিক্রম করা বিশেষত কুরআনে কারীমের ক্ষেত্রে একদম নাজায়েয।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাজবীদের সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াত করার ও কুরআনের হুকুম-আহকাম নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

-বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

১৭-০৩-১৪৪৩ হিজরী

মন্তব্য করুন: