শুক্রবার ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, মাঘ ১৪ ১৪২৯, ০৫ রজব ১৪৪৪

ইসলাম

রোজা ও রমজান: পর্ব-১৮ বিষয়: রোজা রাখার ফযিলত

মুফতি মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন

 প্রকাশিত: ০১:৪৩, ১৪ এপ্রিল ২০২২

রোজা ও রমজান: পর্ব-১৮  বিষয়: রোজা রাখার ফযিলত

এমন মুসলমান যারা সিয়াম পালন করেন একমাত্র মহান আল্লাহকে খুশি করার জন্য। তাদের জন্য অনেক সুসংবাদ রয়েছে। যেমন- 
১। মহান আল্লাহ নিজে সিয়ামের প্রতিদান দিবেনঃ হাদীসে উল্লেখ আছে, মহান আল্লাহ বলেন-
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصَّوْمَ/الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِىْ وَأَنَا أَجْزِىْ بِهِ
‘আদম সন্তানের সকল আমল তারই জন্য। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো সিয়াম। তা শুধু আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৯০৪


২। সিয়াম তুলনাবিহীন ইবাদতঃ সাহাবী আবূ উমামা (রাদি.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দিন যেন এর দ্বারা আমি জান্নাতে যেতে পারি। তিনি বললেন-
عَلَيْكَ بِالصَّوْمِ فَإنَّهُ لَا مِثْلَ لَهُ / عِدْلَ لَهُ
‘তুমি সিয়াম পালন করবে, সিয়ামের মতো আর কোনো আমল নেই।’ সুনানুন নাসাঈ, হাদীস-২৫৩০, ২৫৩৩, 
আবূ উমামা বলেন, আমি তিনবার তাঁকে একই অনুরোধ করলাম এবং তিনি তিনবারই একই উত্তর দিলেন। এ জন্য আবু উমামা (রাদি.) নিষিদ্ধ দিনগুলো ব্যতীত প্রায় ১২ মাসই সিয়াম পালন করতেন। খুতবাতুল ইসলাম, পৃ.-২৮০ 


৩। ক্ষুধা-জনিত গন্ধ মহান আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়ঃ হাদীসে এসেছে-
وَالَّذِىْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ
‘মুহাম্মাদের জীবন যাঁর হাতে তার শপথ, সিয়াম পালনরত ব্যক্তির মুখের ক্ষুধা-জনিত গন্ধ মহান আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়।’ সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৯০৪


৪। সিয়াম হচ্ছে জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঢালঃ হাদীসে এসছে-
اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ مِنَ النَّارِ كَجُنَّةِ أَحَدِكُمْ مِنَ الْقِتَالِ 
‘সিয়াম হলো জাহান্নামের আগুণ থেকে রক্ষার জন্য ঢালের মতো, যুদ্ধের মাঠে প্রতিপক্ষের আঘাত বেঁচে থাকার জন্য তোমাদের যেমন ঢাল রয়েছে। ইবনে মাযাহ, হাদীস-১৬৩৯


৫। পাপমুক্ত সিয়াম মুমিনের এক বছরের অপরাধকে মুছে দেয়ঃ হাদীসে এসেছে-
 الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ.
‘পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে, এক জুমুআ থেকে অপর জুমুআর মধ্যে এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সংগঠিত অপরাধকে মুছে দেয় উল্লেখিত ইবাদত সমূহ। যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস-৫৭৪


৬। জাহান্নামকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরে সরিয়ে দেয়া হবেঃ হাদীসে এসেছে-
مَنْ صَامَ يَوْمًا فِىْ سَبِيْلِ اللَّهِ بَعَّدَ اللَّهُ وَجْهَهُ عَنْ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে বের হয়ে একদিন সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে জাহান্নামকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরে সরিয়ে দিবেন।’ সহীহ বুখারী, হাদীস-২৮৪০


৭। অতীতের সকল ছগীরা গুনাহ ক্ষমা করা হয়ঃ হাদীসে এসেছে-
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম পালন করে, তার অতীতের সকল (ছগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। সহীহ বুখারী, হাদীস- ৩৮


৮। সিয়াম এবং কুরআন মুসলিমের জন্য গ্রহণযোগ্য সুপারিশকারীঃ সিয়াম এবং কুরআন মহান আল্লাহর কাছে মুসলিমের জন্য সুপারিশ করবে, তিনি তা কবুল করবেন। হাদীসে এসেছে-
الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَىْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِىْ فِيْهِ وَيَقُوْلُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِىْ فِيْهِ قَالَ فَيُشَفَّعَانِ
‘কিয়ামতের দিন সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি একে দিনের বেলায় পানাহার এবং জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, হে রব! আমি রাতের বেলায় তাকে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ মুসনাদে আহমদ, হাদীস- ৬৬২৬; মিশকাত, হাদীস-১৯৬৩ 


৯। সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি আনন্দ মুহুর্তঃ হাদীসে এসেছে-
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ 
‘সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি বিশেষ আনন্দ মুহুর্ত রয়েছে। একটি হল, ইফতারের সময়। অপরটি হল, তাঁর রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৭৬৩


১০। সিয়াম পালনে নারীর জান্নাত অবধারিতঃ হযরত আনাস (রাদি.) বর্ণিত হাদীসে এসেছে-
إِذَا صَلَّتْ الْمَرْأةُ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَحَفِظَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا دَخَلَتِ الْجَنَّةَ
‘যদি নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। রমযানের সিয়াম পালন করে। নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস-৭৬৩২


১১। জান্নাতের স্পেশাল দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেঃ হাদীসে বলা হয়েছে-
إِنَّ فِىْ الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ أَيْنَ الصَّائِمُوْنَ فَيَقُومُوْنَ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ
‘জান্নাতে একটি দরজা আছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন সিয়াম পালনকারীরা সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন। তারা ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবেন এবং সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন। যখন তাঁরা প্রবেশ করবেন তখন দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে তাঁরা ব্যতীত অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৮৯৬


প্রিয় উপস্থিতি! আমরা এতক্ষণ সিয়াম পালনকারীর বিভিন্ন ফযিলতের কথা জেনেছি। এছাড়াও বর্তমান আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সিয়ামের বহুবিধ কল্যাণের কথা প্রমাণ করেছে। আমরা ভিন্ন শিরোনামে তা আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ।


মুফতি মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন
সাতাউক মধ্যগ্রাম, লাখাই, হবিগঞ্জ
আমলের কথা জানতে ইউটিউবে সার্চ করুন, 01712961470

মন্তব্য করুন: