বুধবার ৩০ নভেম্বর ২০২২, অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৯, ০৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সাহিত্য

আজ সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের পঞ্চম প্রয়াণ দিবস

 প্রকাশিত: ১৩:৫৭, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

আজ সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের পঞ্চম প্রয়াণ দিবস

বাংলা সাহিত্যজগতের উজ্জ্বল কিংবদন্তি গল্প, কবিতা, উপন্যাস এবং নাটকসহ শিল্প-সাহিত্যের নানা প্রান্তে মেধার স্বাক্ষর রেখে সৈয়দ শামসুল হক পরিচিতি লাভ করেছেন ‘সব্যসাচী লেখক’ হিসেবে। বাংলার মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ, অনুভূতি তার লেখনীতে প্রকাশ পেয়েছে খুব সাবলিল ভঙ্গিমায়।
সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন তিনি।

শিক্ষাজীবন:
সৈয়দ হকের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুলে। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুলে। এরপর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে গণিতে লেটার মার্কস নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ম্যাট্রিক (বর্তমানের এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সৈয়দ শামসুল হকের পিতার ইচ্ছা ছিল তাকে তিনি ডাক্তারি পড়াবেন। পিতার ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে তিনি ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুম্বাই পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেকের বেশি সময় এক সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দেশে ফিরে এসে জগন্নাথ কলেজে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবিক শাখায় ভর্তি হন। কলেজ পাসের পর ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সনে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। এর কিছুদিন পর তাঁর প্রথম উপন্যাস দেয়ালের দেশ প্রকাশিত হয়।

কর্মজীবন:
সৈয়দ হক তার বাবা মারা যাবার পর অর্থকষ্টে পড়লে চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মাটির পাহাড় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেন। পরে তোমার আমার, শীত বিকেল, কাঁচ কাটা হীরে, ক খ গ ঘ ঙ, বড় ভাল লোক ছিল, পুরস্কারসহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেন। বড় ভাল লোক ছিল ও পুরস্কার এই দুটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ত্যাগ করে লন্ডন চলে যান এবং সেখানে বিবিসির বাংলা খবর পাঠক হিসেবে চাকুরি গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসর্মপণের খবরটি পাঠ করেছিলেন। পরে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিবিসি বাংলার প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দৃঢ়কণ্ঠ সাবলীল উচ্চারণের জন্য তিনি জনসাধারণ্যে পরিচিতি লাভ করেন।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান:
সৈয়দ হকের লৈখা ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘রাজা এল শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয় হয়। সৈয়দ হক চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেন। ‘এমন মজা হয় না গায়ে সোনার গয়না’, ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস’, ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’ ইত্যাদি গান সমৃদ্ধ করেছে বাংলা চলচ্চিত্রকে। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর এ ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে থাকেনি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা কিংবা ছোটগল্প রচনা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ একদা এক রাজ্যে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা তাঁর ছোটগল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তাস’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’ প্রভৃতি। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘এক মহিলার ছবি’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘মৃগয়া’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’, ‘ত্রাহি’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘মেঘ ও মেশিন’, ‘ইহা মানুষ’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’, ‘আয়না বিবির পালা’ প্রভৃতি। সৈয়দ হকের লেখা কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘বিরতিহীন উত্সব’, ‘প্রতিধ্বনীগণ’, ‘পরানের গহিন ভিতর’ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা মঞ্চ নাটকেও শক্তিমান এক পুরুষ হিসেবে নিজের লেখনীর প্রমাণ দিয়েছেন সৈয়দ হক। তাঁর লেখা নাটকগুলোর মধ্যে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ সমকালীন অভিপ্রায়ের এক দৃপ্ত প্রকাশ। সৈয়দ হকের লেখা অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘গণনায়ক’, ‘ঈর্ষা’, ‘নারীগণ’, ‘উত্তরবংশ’ ইত্যাদি।

অগণিত পাঠকের ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের প্রায় সব প্রধান পুরস্কারই তার করতলে শোভা পাচ্ছে। পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক। প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বাংলা একাডেমী পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি।

মৃত্যু:
২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিলে তাকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হয়। লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে পরীক্ষায় তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেয়। চার মাস চিকিৎসার পর ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (১২ আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর বুধবার (১২ আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ) চ্যানেল আই টেলিভিশনের তেজগাঁও চত্বরে সকাল ১০টায় প্রথম দফা জানাজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দুপুর ২টায় দ্বিতীয় দফা জানাজা এবং অপরাহ্নে কুড়িগ্রামে তৃতীয় দফা জানাজা শেষে তার মরদেহ কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পাশে দাফন করা হয়।

মন্তব্য করুন: