গোলমালকারীরা ট্রাম্পকে খুশি করতে চাইছে: আয়াতুল্লাহ খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ‘গোলমালকারী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তারা ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে’।
তেহরান এ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে। চিঠিতে তারা বিক্ষোভ যে ‘সহিংস রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বিস্তৃত ভাঙচুরে’ পরিণত হয়েছে তার দায় যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ‘বড় বিপদে’ আছে।
অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে কেন্দ্র করে গজিয়ে ওঠা ইরানের এবারের বিক্ষোভ এরই মধ্যে ১৩ দিন অতিক্রম করেছে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে কয়েক বছরের মধ্যে এত লম্বা ও বিস্তৃত বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মোল্লাতন্ত্রের উচ্ছেদ চাইছেন, কেউ কেউ চাইছেন রাজতন্ত্র ফেরাতে।
বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮ বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ১৪ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে।
ইরানজুড়ে এখনও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বলবৎ আছে।
“তারা ভুগবে এমন জায়গায় আমরা শক্ত আঘাত করবো,” শুক্রবার ইরান প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসে এমনটাই বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তার প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে, তবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মানেই ‘সেখানে সেনা পাঠানো নয়’, বলেছেন তিনি।
“যেটা আমার নজর কেড়েছে তা হল, লোকজন বেশ কিছু শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি,” বলেছেন ট্রাম্প।
আগেরদিন রিপাবলিকান এ প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ইরান সরকার ‘বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করলে’ আমরা তাদের ওপর ‘কঠোর আঘাত হানবো’।
তবে ট্রাম্পের এসব মন্তব্যও খামেনিকে টলাতে পারেনি।
“সবাই জেনে রাখুক, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে কয়েক লাখ সম্মানিত মানুষের রক্তের ভেতর দিয়ে, যারা এর বিরোধিতা করছে, তাদের বিরোধিতায় তা থেকে পিছু হটা হবে না,” শুক্রবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে ৮৬ বছর বয়সী নেতাকে এমনটাই বলতে শোনা যায়।
পরে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে খামেনি বলেন, “ধ্বংসাত্মক উপাদানকে মোকাবেলায় ইরান পিছপা হবে না।” তার এ বক্তব্যও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের কাছে লেখা চিঠিতে জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘হুমকি, উসকানি এবং অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার জন্য উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনার মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ এনেছেন।
২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৪৮ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পাশাপাশি ২ হাজার ২৭৭ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)।
নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস বলেছে, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৫১, যার মধ্যে ৯টি শিশুও রয়েছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি বিক্ষোভে নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সহিংসতার খবরে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেছেন, প্রাণহানির ঘটনায় জাতিসংঘ গভীরভাবে ব্যাথিত।
“বিশ্বের যে কোনো জায়ায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। সরকারগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সেই অধিকার রক্ষা করা এবং সেই অধিকারকে যে সম্মান জানানো হচ্ছে তা নিশ্চিত করা,” বলেছেন তিনি।
এদিকে ইরানের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ার করে সমন্বিতভাবে একের পর এক বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। এসব বার্তায় ক্রমশ তাদের হুমকি-ধামকির মাত্রা বাড়ছে। এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও (এসএনএসসি) ‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত ইরানের ন্যাশনার সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) বলেছে, ‘সশস্ত্র গোলমালকারী’ ও ‘শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। তারা ‘সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি স্থাপনায়’ যে কোনো ধরনের হামলার ব্যাপারে বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশন গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, তারা কোনো ধরনের ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বরদাশত করবে না। ‘শত্রুদের পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ না হওয়া পর্যন্ত’ অভিযান চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে তারা।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবে উৎখাত হওয়া ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি শুক্রবার ট্রাম্পের প্রতি ‘ইরানের জনগণের সহায়তায় হস্তক্ষেপে প্রস্তুত থাকার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটন ডিসির কাছাকাছি বাস করা পাহলভি এর আগে বৃহস্পতি ও শুক্রবার সমর্থকদের রাস্তায় নামার ডাক দিয়েছিলেন।