হিমেল বাতাসে কাবু কুড়িগ্রাম
উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিমেল বাতাসে সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামে শীতের তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরো জেলার জনজীবনে।
প্রায় ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের এই জেলায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ৪৬৯টি চরের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধারসহ ১৬টি নদনদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে শীত দুর্ভোগে রূপ নিয়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, জেলায় গতকাল দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও আজ ভোরে তা নেমে গেছে ১১ ডিগ্রিতে। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য ১০ ডিগ্রি বা তার বেশি হলে ঠান্ডা বেশি অনুভূত হয়। এর সঙ্গে হিমেল বাতাস ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হয়ে শীতের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
তার মতে, নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় কুড়িগ্রামে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা অনেক বেশি থাকে, যা অনেক সময় ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশে পৌঁছায়। আজ সকালে বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। খোলা চরাঞ্চলে গাছপালা ও টেকসই ঘরবাড়ির অভাব থাকায় হিমেল বাতাস সরাসরি মানুষের শরীরে আঘাত হানে। ফলে তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেও শীত কনকনে অনুভূত হচ্ছে।
চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন চিলমারী ইউনিয়নের মনতলা চরের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, দিনে কাজ না করলে রাতে খাবার জোটাতে কষ্ট হচ্ছে।
রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী চর বিদ্যানন্দের আব্দুল আজিজ বলেন, শীতে বাচ্চারা জ্বর-সর্দিতে ভুগছে। খাবার কম, কম্বল নেই—কীভাবে চলবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, চর ও নদীতীরবর্তী শীতার্ত ও হতদরিদ্র মানুষের কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায় প্রকৃত অনেক দরিদ্র পরিবার সরকারি সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে। শীতের কারণে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় দিনমজুর, জেলে ও নৌকানির্ভর মানুষের মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
এ দিকে শীতের প্রকোপে চরাঞ্চলে সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। কুড়িগ্রাম শহরের ভোকেশনাল মোড়ে সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. রকিবুল হাসান বাঁধন জানান, শীতজনিত রোগে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অপুষ্টি ও ঠান্ডা একসঙ্গে থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
রাজারহাটের সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নাজমুন নাহার বিউটি বলেন, শীতের সঙ্গে খাদ্য সংকট ও দারিদ্র্য যুক্ত হলে পরিস্থিতি দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, শুধু কম্বল দিলেই হবে না—পুষ্টিকর খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ জরুরি।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত চরাঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ জরিপ, পর্যাপ্ত কম্বল ও শীতবস্ত্র, খাদ্য সহায়তা এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, শীতার্ত মানুষের সহায়তায় সরকারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, চর ও নদীতীরবর্তী এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।