ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা হলে যুক্তরাষ্ট্র রক্ষা করবে: ট্রাম্প
ইরানে চলমান বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর তেহরান পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, যেকোনো মার্কিন হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। দেশটিতে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর এটাই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিবাদে গত রোববার রাজধানী তেহরানের দোকানদাররা ধর্মঘট শুরু করেন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান যদি তাদের স্বভাবজাত ভঙ্গিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসভাবে হামলা চালায় বা হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত (লকড অ্যান্ড লোডেড) আছি।’
ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
তিনি জানান, যেকোনো হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান আলী লারিজানি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের অর্থ হলো পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করা এবং আমেরিকার স্বার্থকে ধ্বংস করা।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি আরও লেখেন, মার্কিন জনগণের উচিত তাদের সেনাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রাখা।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপদেষ্টা আলী শামখানি বলেন, মার্কিন হস্তক্ষেপের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ইরানের নিরাপত্তা আমাদের কাছে ‘রেড লাইন’।
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লারিজানি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা স্বীকার করেছেন যে দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। পরমাণু কর্মসূচির কারণে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি এবং মুদ্রার মান ধসে যাওয়ায় ইরানের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান গত বৃহস্পতিবার বলেন, জনগণের অর্থনৈতিক কষ্ট দূর করতে না পারলে ধর্মীয় দিক থেকে তাকে ও তার সরকারকে নরকে যেতে হবে। তবে, এর পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে প্রশাসন।
ইরানের পুলিশ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দাবির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আছে। তবে বৈধ দাবি এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মধ্যে তারা পার্থক্য বোঝেন। শত্রুদের কোনোভাবেই অস্থিরতাকে বিশৃঙ্খলায় রূপ দিতে দেওয়া হবে না।
সংঘর্ষ হওয়া লরেস্তান প্রদেশের প্রসিকিউটর জানান, বেআইনি জমায়েত, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সরকারি কাজে বাধা দানকারীদের অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলা ট্রাম্পের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করে ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা দেয়।
গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় আঞ্চলিক মিত্রদের বিপর্যয়ের মুখে ইরান বর্তমানে কিছুটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় অংশ নেয়।
এএফপি’র হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২০টি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে স্থানীয় গণমাধ্যম সব ঘটনা প্রকাশ করে না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বিক্ষোভকে ছোট করে দেখিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো যাচাই করা কঠিন।
এবারের বিক্ষোভ ২০২২ সালের মতো বড় নয়। তখন হিজাব আইন ভঙ্গের অভিযোগে আটক হওয়া মাহসা আমিনি পুলিশি হেফাজতে মারা গেলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েকশ মানুষ নিহত হন।
২০১৯ সালেও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। পরে তা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের দাবিতেও রূপ নেয়।