নবুয়তের ভূমি হিজাজের ভূপ্রাকৃতিক বিস্ময়
হিজাজ আরব উপদ্বীপের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অঞ্চল। ভৌগোলিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আরব উপদ্বীপকে প্রাচীনকালে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা হতো—যেমন হিজাজ, নজদ, ইয়েমেন, আরুদ, তিহামা, আদেন, আহকাফ ও ওমান। এসব অঞ্চলের মধ্যে হিজাজ একটি স্বতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
‘হিজাজ’ শব্দের অর্থ হলো বাধা, প্রতিবন্ধক বা পৃথককারী। এই নামকরণ মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই হয়েছে। হিজাজ অঞ্চল তিহামার নিম্নভূমিকে নজদের উচ্চভূমি থেকে পৃথক করে রেখেছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি তিহামা ও ইয়েমেনকে নজদ থেকে আলাদা করায় এ অঞ্চলকে হিজাজ নামে নামকরণ করা হয়েছে। আবার আরেকটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চারদিক থেকে পাঁচটি আগ্নেয় লাভা ক্ষেত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকার কারণেও এ নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।
ভৌগোলিকভাবে হিজাজ আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এর পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে লোহিত সাগরের উপকূলের সমান্তরালে দীর্ঘ একটি পর্বতশ্রেণী বিস্তৃত। এই অঞ্চল দক্ষিণে বাজা শহর থেকে শুরু হয়ে উত্তরে তাবুক ও লেভান্টের নিকটবর্তী মাদিয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত প্রসারিত। হিজাজকে আরেক নামে ‘আল-জালস’ও বলা হয়, যার অর্থ উঁচু ভূমি। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও ভূগোলবিদ আল-আসমায়ি হিজাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—এই অঞ্চল সানার উপকণ্ঠ থেকে শুরু হয়ে লেভান্টের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর মতে, নজদ ও তিহামার মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক বিভাজক হওয়ার কারণেই এর নাম হিজাজ রাখা হয়েছে। এই ভৌগোলিক বিভাজনের ফলে মক্কা তিহামা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত একটি শহর হিসেবে পরিচিত, আর মদিনা হলো হিজাজ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী। ইতিহাসবিদ আল-আসমায়ি আরও উল্লেখ করেন যে হিজাজ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে—মদিনা, খায়বার, ফাদাক, মারওয়া, আশজা, মুজায়না, জুহায়না, হাওয়াজিন, সুলাইম, হিলাল, হাররাত লায়লা, শাগাব, বাদা ও বালি।
হিজাজ অঞ্চল তার বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক গঠনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এ অঞ্চলে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পর্বতমালা রয়েছে, যেগুলো ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক—উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। হিজাজের উল্লেখযোগ্য পর্বতমালার মধ্যে আছে জাবালে দাকা, জাবালে ইব্রাহিম, জাবালে আথ্রিব, জাবালে শাফা, জাবালে কুরায়নাত, জাবালে হীরা, জাবালে বারদ, জাবালে হাদন, জাবালে আদকাস, জাবালে ওয়ারকান এবং জাবালে সারাত। পর্বতমালার পাশাপাশি হিজাজ অঞ্চলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তৃত আগ্নেয় লাভা ক্ষেত্র, যেগুলো ‘হাররাত’ নামে পরিচিত। হাররাত মূলত কালো বর্ণের পাথুরে ভূমি, যা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নির্গত গলিত লাভা ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এই হাররাতগুলো হিজাজের ভূপ্রকৃতিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
হিজাজ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য হাররাতগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাররাতে আওয়াইরিদ, হাররাতে খায়বার, হাররাতে নার, হাররাতে লায়লা, হাররাত রাহাত, হাররাতে আশজা ইত্যাদি। পাহাড় ও হাররাত ছাড়াও হিজাজ অঞ্চলে বিস্তৃত সমভূমি, উর্বর উপত্যকা ও প্রাকৃতিক জলধারা রয়েছে, যা এ অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি হিজাজে অবস্থিত সারাওয়াত পর্বতমালা, যার বিভিন্ন শাখার মধ্যে সারাওয়াত জাহরান, সারাওয়াত গামিদ, সারাওয়াত বাজিলা ও সারাওয়াত তাইফ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকেও হিজাজ অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে সোনা, রুপা, লোহা, তামা, সিসা, জিপসাম, কাদামাটি এবং আরও নানা ধরনের খনিজ সম্পদের উপস্থিতি রয়েছে, যা প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। জলবায়ুর দিক থেকে হিজাজ তুলনামূলকভাবে নাতিশীতোষ্ণ। বিশেষ করে উচ্চভূমি এলাকাগুলোতে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে আসে, যা অঞ্চলটিকে আরব উপদ্বীপের অন্য অংশের তুলনায় বেশি আরামদায়ক করে তোলে।