শুক্রবার ০২ জানুয়ারি ২০২৬, পৌষ ১৯ ১৪৩২, ১৩ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভেনেজুয়েলায় ৮৮ ভিন্নমতাবলম্বীর মুক্তি নববর্ষে প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় ২০ জন নিহতের ঘটনায় ইউক্রেন দায়ী: রাশিয়া ইরানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে সংঘর্ষে নিহত ৬ ৪৬তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ বিএনপি আমলে র‌্যাবকে ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি’, দাবি বাবরের সঞ্চয়পত্রে মুনাফার সর্বোচ্চ সীমা কমলো আওয়ামী লীগ থেকে এসে যোগ দেন, দায়-দায়িত্ব আমাদের: জামায়াতের লতিফুর রংপুর-১: জাপা প্রার্থী মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র বাতিল এনইআইআর চালু, প্রতিবাদে বিটিআরসি কার্যালয়ে মোবাইল ব্যবসায়ীদের হামলা, ভাঙচুর ২৮৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ: সালমান এফ রহমান, ভাই ও ছেলেদের বিরুদ্ধে চার মামলা করছে দুদক নিউ ইয়র্কের মেয়র হিসেবে কোরান ছুঁয়ে শপথ নিলেন জোহরান মামদানি পাবলিক প্লেসে ধূমপান-তামাক সেবনে জরিমানা ২ হাজার ই-সিগারেট, ভ্যাপ নিষিদ্ধ করে অধ্যাদেশ জারি পশ্চিম তীরের শরণার্থী শিবিরে ২৫ ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইল মাদকবাহী নৌকায় হামলায় নিহত ৮

সংস্কৃতি

খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম

 প্রকাশিত: ১৬:৪০, ২ জানুয়ারি ২০২৬

খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম

মঈনুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন সরকারের সময় টিভি চ্যানেলগুলো লাইভ দেখাচ্ছিল, খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে সৌদি আরব চলে যাচ্ছেন। বিমান বন্দরে বিশেষ বিমান ও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে তারা জানায়। লাইভ ব্রডকাস্টের জন্য টিভি চ্যানেলগুলো তার বাড়ির আশপাশে অবস্থান করছিল। তারেক ও কোকোকে ধরে নিয়ে গেছিল জরুরি অবস্থার সরকার। তবু ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তার সাথে দেশ না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন খালেদা জিয়া। সৌদি দূতাবাস জানায়, যিনি সৌদি যাবেন, ভিসার জন্য তাকে আবেদন করতে হবে। অথচ তিনি আবেদনই করেন নাই। এই ছিল তাঁর দেশপ্রেম।

ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। রামাদানের প্রথম ইফতার করতেন, তিনি ইয়াতিম ও উলামায়ে কেরামকে নিয়ে। শাহবাগে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে তোলা হয়। সেখানে ‘ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই’, বলে এক রঙমঞ্চের আসর বসেছিল। রাত দিনের ভেদাভেদ নেই। সর্বস্তরের মানুষকে সেখানে গিয়ে তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। যুদ্ধপরাধের শাস্তির দাবির আড়ালে সেখানকার একদল ব্লগার আল্লাহ, রাসূল ও আল-কুরআন নিয়ে কটাক্ষ করত। এর প্রতিবাদে গড়ে উঠে ইসলামি জনতার শাপলা চত্বর মঞ্চ। হেফাজতের পক্ষ থেকে আল্লাহ ও রাসুলের অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ৫ মে ২০১৩ সালে লংমার্চ করে ঢাকা অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। ঢাকার প্রবেশ মুখে ছয়টি স্থান অবরোধ করে সারাদেশ থেকে আসা লংমার্চকারীগণ। ফজরের পরই ঢাকার প্রবেশ দ্বারগুলো দখলে নেয় জনতা। জনস্রোত দেখে দিশেহারা হয়ে সরকার বেলা বাড়ার পর তাদের শাপলা চত্বরে জমায়েতের অনুমতি দেয়। শাপলায় আসার পথেই আলেম ও ইসলামি শিক্ষার্থীদের ওপর পথে পথে ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়েনারা। আমিরে হেফাজতকে মঞ্চে আসতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে বিমানে উঠিয়ে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের দাবিতে শাপলায় রাতে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন পরোক্ষভাবে ঢাকাবাসীকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। উলামায়ে কেরাম ও নিরীহ মাদরাসার ছাত্রদের ওপর যখন রাতের অন্ধকারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় এর তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা যখন পালিয়ে যান। একটি প্রতিশোধমূলক কথা তিনি বলেননি। একটি ব্যঙ্গাত্মক কথাও না। অথচ শেখ হাসিনা তাঁকে বাড়ি ছাড়া করেন। এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেন। ভুয়া মামলায় জড়িয়ে জেলে পুরে রাখেন। তাঁর মেডিক্যাল বোর্ড দেশের বাহিরে তাঁকে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু কোনোভাবেই শেখ হাসিনা তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেননি। উল্টো তাঁর অসুস্থতা নিয়ে শেখ হাসিনা খেদোক্তি করেন। তার অশ্রাভ্য ভাষার কটূক্তি ছিল এরূপ- ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ, এই মরে মরে, এই যায় যায়, তে বয়স তো আশির উপরে , মৃত্যুর তো সময় হয়ে গেছে, তার মধ্যে অসুস্থ, তার লিভার নাকি পচে শেষ, কি খেলে তাড়াতাড়ি লিভার পচে ইত্যাদি...।’

হাসিনার পালানোর পর তবু তার সম্পর্কে কোনো কটু কথা বলেননি। বরং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। ফ্যাসিবাদের পতনের পর সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানগুলোতে মধ্যমণি হিসেবে খালেদা জিয়াকে দেখা যেত। আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাঁকে নিজেদের ভরসার স্থল মনে করত। সর্বশেষ যখন তিনি ২১ নভেম্বর ২৫ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তখন তিনি রোগ শোকে কাতর। হুইল চেয়ারে করে কোনো মতে তাঁকে অনুষ্ঠানে আনা হয়। এদিনই বাংলাদেশে একটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সময় সেনাবাহিনী প্রধান যখন তাঁর হুইল চেয়ার ধরে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসেন, তাঁকে দেখেই খালেদা জিয়া জিজ্ঞেস করেন, ভূমিকম্পের পর দেশের জনগণ কেমন আছেন। যা লাইভ অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি দেখা গেছে। এটিই ছিল তাঁর সর্বশেষ জনসমক্ষে আসা। এখান থেকে ফেরার পর তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে।

সর্বশেষ তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সের ও ব্যবস্থা করা হয়। হয়ত অন্তিম সময় হয়ে গেছে ভেবে তিনি নিজেই দেশের বাহিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর এতই ভালোবাসা, এখানেই তিনি মরতে চেয়েছিলেন।

শেষ বিদায়

খালেদা জিয়ার ইহকাল থেকে বিদায়ের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের আকাশে সূর্যের দেখা মিলেনি। ৫৮ দিন হাসপাতালের বেডে ছিলেন। ২০২৫ সালের বিদায় নেওয়ার আর মাত্র এক দিন বাকি, ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর মাঝখানে ছিল ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবন। তাঁর অভূতপূর্ব জানাযায় গণমানুষের ঢল নামে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তিনজন আলেম তাঁর খাটিয়া বহন করেছেন। শায়খ আহমাদুল্লাহ, শায়খ মামুনুল হক ও শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী। বাংলাদেশের ইলমী জগতে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁরা তিন দিকপাল। জানাযায় ইমামতি করেন বাংলাদেশের ফকীহ আলেম, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররামের খতীব মুফতী আবদুল মালিক। এভাবেই আপসহীন অভিযাত্রার সমাপ্তি।