হারিরা ও নাফির ছাড়া অপূর্ণ মরক্কোর রমজান
রমজান মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও বৈচিত্র্যের অনন্য প্রতীক। রমজানে মুসলমানরা যেমন এক আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়, তেমনি তারা স্থানীয় নানা রীতি ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে রমজানকে উত্যাপন করে। জাতি, সমাজ ও অঞ্চল ভেদে মুসলমানদের রমজান উদযাপনের রীতি ভিন্ন ভিন্ন। উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর রমজান সংস্কৃতির এমন দুটি রীতির নাম হারিরা ও নাফির। হারিরা ও নাফির ছাড়া মরক্কোর মুসলিমদের রমজান উদযাপনকে যেন পূর্ণতায় পায় না।
আরবি হারিরা শব্দের অর্থ গরম। হারিরা উত্তর আফ্রিকার একটি ঐতিহ্যবাহী স্যুপ। এটি প্রধানত মরক্কো ও আলজেরিয়াতে খাওয়া হয়। কারো কারো মতে, শব্দটি হারির বা রেশম শব্দ থেকে এসেছে। যা স্যুপটির উচ্চপুষ্টি এবং মনোহর স্বাদের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। ঐতিহাসিকদের মতে, হারিরার উত্পত্তি মরক্কোর মাটিতেই হয়েছে। দেশটির ইফতার আয়োজনে হারিরা স্যুপ একটি অপরিহার্য অংশ। গোশত, ডিম, সবজি ও লেবুর রস যোগে প্রস্তুত করা হয় নানা ধরনের হারিরা। হারির শুধু মরক্কোর মুসলমানরাই ইফতারের সময় খেতে পছন্দ করে না, বরং দেশটির ইহুদিরাও তাদের ধর্মীয় উত্সবের দিন তা থেকে পছন্দ করে।
হারিরা তৈরির প্রধান প্রধান উপাদান হলো, ময়দার তৈরি তাদৌইরা, টমেটো, মসুর ডাল, ছোলা, মটরসুটি, পেয়াজ, ভাত বা ভাজা সেমাই ও সামান্য পরিমাণ জলপাই তেল। এর সঙ্গে যোগ করা হয় পরিমাণ মতো মাংস। গরু, ভেড়া ও মুরগির মাংস। তবে হারিরাতে ভেড়ার মাংস খেতেই বেশি পছন্দ করে মরক্কোর মানুষ। পরিবেশন করার সময় এতে লেবুর রস, ডিম কুচি ও জিরার গুড়ি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কখনো কখনো হারিরা সঙ্গে দেওয়া বিশেষ ধরনের রুটি।
আর বিশেষ ধরনের বাঁশিকে বলা হয় নাফির। রমজান মাসে এই বাঁশি বাঁজিয়ে মানুষকে ঘুম থেকে জাগ্রত করা হয়। যারা বাঁশি বাজান তাদেরকে বলা হয় নাফার। রমজান ছাড়াও ঈদুল ফিতরের সময়র নাফাররা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে শিশুদের আনন্দ দিয়ে থাকে। নাফাররা রমজান মাসে রাত তিনটার সময় থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে সাহরি খাওয়ার জন্য জাগ্রত করে। ভোর রাতে মানুষকে জাগিয়ে দেওয়ার এই রীতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। একেক অঞ্চলে একেক ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং যারা ডাকে তাদেরকেও ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও জীবনধারার প্রভাবে সারা পৃথিবীতেই নাফারদের আবেদন দিন দিন কমে যাচ্ছে।
বর্তমানে মরক্কোর প্রাচীন নগরীগুলোতেই নাফারদের দেখা যায়। আধুনিক শহরগুলোতে তাদের উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। নাফাররা রাতে রোজাদারদের ডেকে দেওয়ার সময় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে। তারা জাল্লাবা নামক বিশেষ লম্বা জুব্বা, উঁচু তারবুচ টুপি, চামড়ার তৈরি বেলঘা জুতা এবং সাদা মোজা পরিধান করে থাকে। নাফাররা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে নাফির বাজায় আর স্থানীয়রাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রি উপহার দিয়ে থাকে।