বুধবার ০৪ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২০ ১৪৩২, ১৫ রমজান ১৪৪৭

ব্রেকিং

দুইজন উপদেষ্টা এবং আটজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পুনর্বণ্টন মুন্সীগঞ্জে চোর সন্দেহে ‘গণপিটুনি’, হাসপাতালে ২ জনের মৃত্যু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ, সাশ্রয়ে জোর জ্বালানিমন্ত্রীর ভূমধ্যসাগরে পরমাণু রণতরী ‘চার্লস দ্য গল’ পাঠাচ্ছে ফ্রান্স ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধে ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব ভিসা ও গ্রিন কার্ডের প্রসেসিং ফি বাড়ালো যুক্তরাষ্ট্র আটকা পড়া প্রবাসীদের জন্য দুবাইয়ে ইউএস-বাংলার দুটি বিশেষ ফ্লাইট ইরানে হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ছেলে: ইসরায়েলি ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম আইআরজিসিকে গুঁড়িয়ে দিতে ২০০০ লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানা হয়েছে: ইউএস সেন্টকম দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইরানই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে: বিশ্লেষক

আন্তর্জাতিক

মোজতোবা খামেনি: পশ্চিমা মিডিয়া যাকে ইরানের নতুন নেতা বলছে, সে কে?

 প্রকাশিত: ১৫:০৮, ৪ মার্চ ২০২৬

মোজতোবা খামেনি: পশ্চিমা মিডিয়া যাকে ইরানের নতুন নেতা বলছে, সে কে?

চারদিন আগে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলায় নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনি-ই ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন বলে একাধিক পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমে আভাস দেওয়া হয়েছে।

সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী বিরোধীদের সংবাদমাধ্যম লন্ডনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনালও বলছে, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেছে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ প্রয়াত নেতা খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ৫৬ বছর বয়সী তার মেঝ ছেলেকেই বেছে নিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এখনও এ বিষয়ে কিছু বলেনি। আল-জাজিরা বা মধ্যপ্রাচ্যের খবরাখবর বেশি রাখা কোনো গণমাধ্যমও মোজতোবা-ই ইরানের পরবর্তী নেতা—এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।

বাবার ছায়ায় থাকা মোজতোবা-কে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পরবর্তী নেতা ধরে নিয়েছিলেন। তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে বলে ভাষ্য খামেনি অনুসারীদের।

এদিকে সমালোচকরা বলছেন, বড় মাপের আলেম না হয়েও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে মোজতোবার আরোহনের পেছনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। ইরানে খুবই প্রভাবশালী এ বাহিনীতে মোজতোবার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

মোজতোবা বেশিরভাগ সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকেছেন, সরকারি কোনো দায়িত্বেও ছিলেন না; তার বক্তৃতার সংখ্যাও বিরল, গণমাধ্যমে তাকে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকবার। কিন্তু ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোতে তার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত।

১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতোবা ৬ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার ছোটবেলাতেই তার বাবা ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলে যায়, রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে খামেনি পরিবার।

তেহরানে চলে আসা মোজতোবা পড়তে যান আলাভি হাই স্কুলে; এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট অনেকে উঠে এসেছেন। আলাভি থেকে মোজতোবা পরে যান কোমে, রক্ষণশীলদের আলেমদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে। দশকেরও বেশি সময় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় কাটালেও তিনি আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারেননি।

সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতার ধর্মীয় পদমর্যাদাও উঁচুতে থাকার কথা, যে কারণে মোজতোবার ক্ষমতাগ্রহণ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে আপত্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মোজতোবা হাবিব ব্যাটেলিয়নে যুদ্ধ করেছিলেন; পরবর্তীতে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন পদে আরোহন করা অনেকের সঙ্গে তার সেসময়ই খাতির হয়।

নির্বাচনে জয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি দায়িত্বে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বাবার কার্যালয়ের ‘অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে দেখতেন ইরানি শাসনব্যবস্থার ভেতরের লোকজন। একই কথা বলা হতো আহমাদ খোমেনির ক্ষেত্রেও, যিনি ছিলেন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির ছেলে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোজতোবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আয়াতুল্লাহ খামেনি তার দায়িত্বের কিছুটা ছেলের কাছে হস্তান্তর করেছেন অভিযোগ করে ওয়াশিংটন সেসময় বলেছিল, জবাবদিহিতার বাইরে থেকে মোজতবা সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

ইরানের অনেক সংস্কারপন্থি রাজনীতিক এবং বিদেশি সরকারগুলোও মোজতোবার বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ বারবারই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লুমবার্গ বলছে, পশ্চিমা একাধিক দেশে বেনামে মোজতোবার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও তার সম্পদের পরিমাণ ঠিক কত, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি তারা।

একাধিক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন কয়েকদিন আগে বলেছিল, মৃত্যুর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনি তার উত্তরসূরি হিসেবে তিন জ্যেষ্ঠ আলেমের নাম বলে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে মোজতোবা ছিল না।

তা সত্ত্বেও বাবার পরে মোজতোবা শীর্ষ নেতার পদে বসলে রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের গোড়াপত্তন করা শাসনব্যবস্থা বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। সেক্ষেত্রে শাসনকাঠামোতে নিজের অবস্থান পোক্ত করাই মোজতোবার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মোজতোবার ‘ক্ষমতায় আরোহনের পেছনে মূল প্রভাব’ রেখেছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী।

“আইআরজিসি নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা আলেমদের ওপর মোজতোবাকে বেছে নিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিল,” বলছে ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থাবিরোধী এ সংবাদমাধ্যম।

দায়িত্ব পেলে মোজতোবাকে একদিকে ‘প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে থাকা’ আইআরজিসিরি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল যেমন ঠিক করতে হবে, তেমনি ইসরায়েল ‍ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেও নানান ব্যবস্থা নিতে হবে। ইরাক সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট কুর্দিদেরসহ সব সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় যেমন তার চোখ থাকতে হবে, তেমনি মোল্লাতন্ত্রবিরোধী নতুন বিক্ষোভ গজিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাও থামাতে হবে।

সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, যা দশকের পর দশক ধরে থাকা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অনেকটাই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার কথাই চূড়ান্ত। তিনি পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যাপার দেখভাল করেন। সর্বোচ্চ এ নেতা আইআরজিসিসিহ দেশটির সশস্ত্র বাহিনীগুলোর কমান্ডার-ইন-চিফ’ও। আইআরজিসি তাদের কাজের জন্য সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কাছেই জবাবদিহি করে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছিল।