শুক্রবার ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, পৌষ ২৬ ১৪৩২, ২০ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

রাশিয়ার বোমা হামলায় ইউক্রেনে হতাহত ১৬ আলেপ্পোয় সংঘর্ষের পর সিরিয়ার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ইরানে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, তেহরানের সড়কে মানুষের ঢল ২৯৫টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম বেঁধে দেবে সরকার গাজীপুরে এনসিপি নেতাকে গুলি করে মোটরসাইকেল ছিনতাই জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে, অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি রংপুরে শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্ন ‘ফাঁসচক্রের দুই সদস্য’ গ্রেপ্তার প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা: ৮ আসামি দুই দিনের রিমান্ডে দিনভর ভুগিয়ে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার বন্ডাই বিচে বন্দুক হামলা : রয়েল কমিশন গঠনের ঘোষণা অস্ট্রেলিয়ার সোমালিয়ায় খাদ্য সহায়তা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র তীব্র তাপপ্রবাহে অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘কর্তন নিষিদ্ধ’ গাছ কাটলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অধ্যাদেশ জারি সাগরে গভীর নিম্নচাপ, অব্যাহত থাকবে শৈত্যপ্রবাহ দিপু হত্যা: লাশ পোড়ানোয় ‘নেতৃত্ব’ দেওয়া যুবক গ্রেপ্তার সিরাজগঞ্জে ইজিবাইক চালককে হত্যায় ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড মুছাব্বির হত্যায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা পাতানো নির্বাচন হবে না: সিইসি গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় ১০০ জন নিহত হয়েছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ইসলাম

মুসলমানদের ভূগোলচর্চা

 প্রকাশিত: ১৪:৩৪, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

মুসলমানদের ভূগোলচর্চা

 পুরাকালে ‘ভূবিদ্যা’ বলতে পৃথিবীর আকৃতি, ভূমি জরিপ ইত্যাদি বুঝানো হতো। পৃথিবীর আকৃতির আরবি প্রতিশব্দ ‘সুরাতুল আরদ’। প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোলবেত্তা মাসউদীর (মৃত্যু ৯৫৬ সাল) ভূবিদ্যা বলতে ‘কাতউল আরদ’ বা ভূমি জরিপ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ১৩৪৭ সালের দিকে ‘রাসাইলু ইখওয়ানুস সাফা’ গ্রন্থে ভূবিদ্যা বুঝাতে ‘পৃথিবীর মানচিত্র’ বুঝানো হয়েছে। মধ্যযুগ পর্যন্ত এই ধারণাই প্রচলিত ছিল। তবে আধুনিকালে পৃথিবী সম্পর্কীয় যাবতীয় আলোচনাই ভূবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত।

ডব্লিউ জিমারম্যানের মতে, ‘পৃথিবীর জলস্থল, পাহাড়-পর্বত, মৃত্তিকা, অরণ্য-জলবায়ু, দেশ-দেশান্তরের মানুষ, মানুষের প্রয়োজনে উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের ভাগ্য কার্যক্রম ইত্যাদি সম্পর্কে বিহিত হওয়াই ভূগোলের মর্মকথা।’ আজকাল আকাশ, সমুদ্র, কৃষি, জ্যোর্তিবিদ্যা সব আলোচনাই ভূবিজ্ঞানের আওতায়ভুক্ত। এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশে ইসলামের অবদান অপরিসীম। বলতে গেলে জাহেলি যুগে প্রাচীন ব্যবলনীয় সভ্যতায় ভূবিজ্ঞানের যে ধারণার জন্ম হয় তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে ইসলামী যুগে। ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার পর এই ধারণায় যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। আর এই ধারণার মূল উত্স ছিল ঐশিগ্রন্থ আল-কুরআন। কোরআন অসংখ্য বিজ্ঞান ও জ্ঞান গবেষণার আধার। কোরআনের মূল চেতনায় আকৃষ্ট হয়ে মুসলমানরা ভূবিজ্ঞান র্চ্চায় আগ্রহী হয়ে ওঠে।অবাক হওয়ার বিষয় যে পবিত্র কুরআনে পৃথিবী বক্ষে পাহাড়-পর্বত, বিভিন্ন প্রকার ভূমি সৃষ্টি, আবহাওয়া, মেঘমালা, পানি, সমুদ্র, জাতি, জনপদ, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদির বিবরণ বিধৃত হয়েছে। ফলে ভূবিজ্ঞানের চিন্তা ও প্রেরণা এসেছে কোরআন থেকেই। যেমন পাহাড় সম্পর্কে সুরা নাহলের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এবং তিনিই পৃথিবীপৃষ্টে পাহাড়সমূহ স্থাপন করেছেন যাতে তা তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।’

পৃথিবীর আবহাওয়া সম্পর্কে সুরা নূরের ৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন তারপর তাদের একত্রিত করেন, অতঃপর দেখান তা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে, আর আকাশস্থিত শিলাস্তুপ থেকে তিনি বর্ষণ করেন শিলা।’

সমুদ্র বিষয়ে সুরা নাহলের ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘তিনিই সাগরকে অধীন করে করেছেন, যাতে তোমরা উহা হতে তাজা মত্স আহরণ করতে পার।’ 

দিন রাতের পরিক্রমা এবং সূর্য ও চাঁদের উদয়-অস্ত সম্পর্কে চমত্কার বর্ণনা রয়েছে সুরা ইয়াসিনে। আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য ছুটে চলে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। এটা মহা পরাক্রান্ত সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে এবং চন্দ্রের জন্যেও আমি নির্দিষ্ট নিজস্ব কক্ষপথ ঠিক করে দিয়েছি।’

সুরা আনআমের ৯৭ নম্বর আয়াতে নক্ষত্রপুঞ্জ সৃষ্টির রহস্য ও প্রয়োজন সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্যে নক্ষত্রপুঞ্জ সৃষ্টি করেছেন যেন তা থেকে তোমরা জলে ও স্থলে অন্ধকারে দিক নির্ণয় করতে পার। চিন্তাশীল জ্ঞানীদের জন্যে আমি এ আয়াত বর্ণনা করেছি।’

হাদিস সংকলন ও ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে ইসলামের প্রাথমিক যুগেও মুসলিমরা ভৌগলিক শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যায় ভৌগলিক শিক্ষা বিস্তারের উত্কর্ষ। শুরু থেকে ভৌগলিক বিষয়ে মুসলমানদের আগ্রহের একটা কারণ এই ছিল যে নবীজির হাদিসে বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনায় স্থানীয় নামগুলোর উল্লেখ করা হতো। এর ফলে এসব স্থানের ভৌগলিক তালিকা প্রণয়ন ও বিশিষ্ট স্থানগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণও প্রকাশ করা হতো। তারপর খেলাফতের বিস্তৃতির সাথে সাথে বিশেষ প্রয়োজনে এই শিক্ষা প্রাধান্য পেতে লাগল। তখন প্রধান প্রধান সামরিক ঘাঁটি, নদ-নদী, মরু-পর্বত, রাস্তা-ঘাট প্রভৃতির অবস্থান এবং বিজিত দেশগুলোর আয়তন, উত্পন্ন ফসল ও দ্রব্যাদি এবং শহর ও লোকালয়গুলোর বিষয়ে পরিচয় লাভের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। শাসকার্যের সুবিধার জন্যে সরকারি কর্মচারিদের নিত্য ব্যবহার্য বিজিত দেশগুলোর পূণাঙ্গ বিবরণী ও সীমান্তবর্তী দেশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয়-সম্বলিত বই রচনারও প্রয়োজন ছিল। ফলে মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম থেকেই ভৌগলিক শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেন এবং ভূতত্ত্ববিষয়ক পুঁথি-পুস্তক প্রণয়ন করতে শুরু করেন

ভূগোলশাস্ত্রে মুসলমানদের অগ্রগতির আরো একটি কারণ আছে। এটি হলো হজ পালনের অপরিহার্যতা। এটি প্রত্যেক সম্পদশালী মুসলমান যাদের করার সামর্থ্য আছে তাদের জন্যে ফরজ ইবাদত।হজ পালনের জন্য মুসলমানদের মক্কার কাবাশরিফে গিয়ে হাজির হতে হয়। ফলে মক্কাশরিফ সারা মুসলিম জগতের ভৌগলিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। হজকে কেন্দ্র করে দুনিয়ার প্রতিটি জনপদ থেকে মুসলমানরা সৌদিআরবে আসেন। ফলে নানা দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার ও ঐসব দেশের ভূপ্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে পারস্পরিক মত ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। আর এই হজের কারণে নানা দেশে রচিত হতো নানা রকম ভ্রমণের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বই-পুস্তক। এসব বই-পুস্তকে সফরকারী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা, মানুষের সাথে মেলামেশার বিবরণ, আবহাওয়া, স্থান, জনপদ ও সেখানকার পরিবেশ প্রতিবেশ সম্পর্কে মতামত পরিবেশিত হতো। কালক্রমে এভাবেই ভূগোল বিষয়ে গড়ে উঠে জ্ঞানসাধনার এক বিশাল ভা্লার। এ বিষয়ে জুরজি জায়দান বলেন, ‘পবিত্র হজ পালন, মসজিদের কিবলা নির্ধারণ এবং নামাজের সময় নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা মুসলমানদের ভূগোল গবেষণার মূল প্রেরণা ছিল।’ 

আর এভাবেই প্রকৃত অর্থে মুসলমানদের হাত ধরেই এগিয়ে যায় ভূগোলশাস্ত্র। এর ফলে মুসলিম সমাজে অসংখ্য ভৌগলিক বিজ্ঞানীর আর্বিভাব ঘটে। তাদের মধ্যে কতিপয় বিশিষ্টজন হলেন আল-খারিজমি (মৃত্যু ৮৪৭), আল-ফারগানি (মৃত্যু ৮৬০), ইবনে খুরদাদবাহি (মৃত্যু ৮৭০ সাল), ইয়াকুব বিন ইসহাক আল-কিন্দি (মৃত্যু ৮৭৪), জাফর বিন মুহম্মদ বলখী (মৃত্যু ৮৮৬), বাবিত বিন কুরা (মৃত্যু ৯০১), আল-বাত্তানি (মৃত্যু ৯২৯), আবু জায়েদ বখলি (মৃত্যু ৯৩৭ সাল), আল-ইস্তাখরি (মৃত্যু ৯৫০ সাল), ইবনে হাইকল (মৃত্যু ৯৭৫ সাল), আবনে ইউনুস (মৃত্যু ১,০০০)। তার পরবর্তী সময়ে আরো অনেক মুসলিম ভূগোলবিদ ভূবিজ্ঞান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের কয়েকজন হলেন, আবু হামিদ আন্দালুসি (মৃত্যু ১১৬২), আল-মাজিনি (মৃত্যু ১১৬৯), ইবনু সাঈদ (মৃত্যু ১২৭৪), আবুল ফিদা (মৃত্যু ১৩৩১), ইবনে বতুতা (মৃত্যু ১৩৭৭), ইবনে খালদুন (মৃত্যু ১৪০৬) প্রমুখ।

দশ শতকের দিকে এসে বেশ কজন বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলজ্ঞ ভূতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করেন। রচনা করেন উত্কৃষ্ট সাহিত্য ও বিজ্ঞান কর্ম। তাদের অন্যতম হলেন আল-মুকাদ্দসি। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ভূগোল শাস্ত্রবিদ। অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের কারণে আল-মুকাদ্দসি জগত্ খ্যাত ভূগোল শাস্ত্রবিদের মর্যাদায় অভিসিক্ত হন। আরবের জেরুসালেম শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জেরুসালেমে দুনিয়ার প্রথম কিবলা ‘বায়তুল মাকদাস’ অবস্থিত। আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ) এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর সোলায়মান (আ) এই মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। সেটা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৮২৪ সালের কথা। এই বায়তুল মাকদাসের নামানুসারেই ‘আল-মুকাদ্দসি’ মুকাদ্দসি নামে পরিচিতি লাভ করেন।