জানাজার নামাজে চোখের পানি
জানাজা শেষ বিদায়ের নামাজ। তবে এই নামাজ ইমামের পেছনে নয় বরং ইমামের সামনেই নিথর দেহখানি খাটিয়ার ওপর রেখে আদায় করা হবে। জানাজা শব্দের অর্থ লাশ। মৃত ব্যক্তির মাগফিরাত কামনায় তার লাশ সামনে নিয়ে বিশেষ নিয়মে যে দোয়া করা হয় তার নাম জানাজার নামাজ। জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া হওয়ায় সমাজের পক্ষ থেকে কেউ আদায় করলে পুরো সমাজের হক আদায় হয়ে যায়। মুসলমানরা মারা গেলে জানাজা দিয়েই কবর দেওয়া হবে।
জানাজার নামাজের জন্য একদিন আমাদের খাটিয়ায় শুতেই হবে। কেননা কোনো একদিন আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে, শুধু অপেক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি জীবনদান করেন আর তিনিই মৃত্যু ঘটান। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, কোনো সাহায্যকারীও নেই’ (সুরা : তওবা ১১৬)।
জানাজার নামাজে মৃত ব্যক্তির প্রতি আবেগ, শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা প্রকাশ পায়। প্রিয় মানুষের মৃত্যুসংবাদ শুনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন কাজকর্ম রেখে দূরদূরান্ত থেকে শেষবারের মতো জানাজার নামাজ আদায়ের জন্য ছুটে আসে। তারা শেষ বিদায় জানাতে, শেষবারের মতো চেহারা দেখতে, চোখে অশ্রু ফেলে বিদায় জানাতে আসে। জানাজার নামাজ শেষে কবর দেওয়ার পরও চোখে প্রিয় মানুষের প্রতি ভালোবাসার অশ্রু দেখা যায়। যারা জানাজার নামাজে উপস্থিত হয়ে কবর দেওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে তাদের বিষয়ে সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জানাজার নামাজ পড়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে, সে এক কিরাত সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি দাফন করা পর্যন্ত উপস্থিত থাকবে, তার জন্য দুই কিরাত সওয়াব পাবে। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন দুই কিরাতের পরিমাণ কতটুকু? উত্তরে রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, দুই বড় পাহাড়ের সমান।’
জানাজার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে প্রিয় মানুষের নিথর দেহ দেখলে মন পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক। তিনি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ আমাদের সবাইকে রেখে একা চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। তিনি ফিরে আর আসবেন না, পরামর্শ দেবেন না, মায়াবী কণ্ঠে নাম ধরে ডাকবেনও না, শাসনও করবেন না। কবরে থাকবেন রাতের পর দিন, মাসের পর বছর, বছরের পর যুগ যুগ ধরে। একদিন কবরের সঙ্গে নামটিও বিলীন হয়ে যাবে। আমিও এভাবে তার পেছনেই ছুটে চলছি। আজ কিংবা কাল। চলে যেতে হবে মাটির ঘরেই। জানাজার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মনকে নরম করেও মৃত্যু এবং কবরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এজন্য কেউ মারা গেলে জানাজার নামাজে উপস্থিত হওয়া খুবই জরুরি। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের অধিকার পাঁচটি। ১. সালামের উত্তর দেওয়া, ২. অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নেওয়া, ৩. জানাজার অনুসরণ করা, ৪. দাওয়াত কবুল করা, ৫. হাঁচির উত্তর দেওয়া। (বুখারি শরিফ)।
জানাজার নামাজে মৃত ব্যক্তিকে সামনে রেখে পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি কথা বলা হলেও বর্তমান সময়ে দেখা যায় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিনা প্রয়োজনে নিজের ও দলের পরিচিতির জন্য একের পর এক বক্তব্য প্রদান করে থাকে, যা মোটেই উচিত নয়। ছবি ও ভিডিও করার বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা লাশকে দ্রুত কবরস্থানে নিয়ে যাও। কেননা মৃত ব্যক্তি যদি নেক লোক হয়, তাহলে কল্যাণের দিকেই তোমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছ। আর যদি মন্দ হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে তোমাদের ঘাড় থেকে আপদ সরিয়ে দিচ্ছ।’ (বুখারি শরিফ)
প্রিয় পাঠক, আপনি জানাজার নামাজে দাঁড়িয়ে মনে করুন এই জানাজার নামাজ আমার নিজেরই হতে পারত। একটু পর হয়তো আমাকে এখানেই নিয়ে আসা হবে। তাই কবরের আজাব, কেয়ামতের কঠিন মুহূর্ত, জাহান্নামের আগুনের কথা চিন্তা করে সব অন্যায়ের জন্য চোখের অশ্রু ফেলে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে। কেউ যেন বলতে না পারে আমি বেয়াদব ছিলাম, অন্যকে কষ্ট দিয়েছি, মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি, আমার কারণে অন্যরা কষ্ট পেয়েছে। আমার সব ধরনের ঋণ সর্বক্ষণ পরিশোধ রাখতে হবে। কেননা কখন যেন মৃত্যু হয়ে যায়। কেননা জানাজা সামনে এলে রসুলুল্লাহ তার ঋণের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। যদি জবাব হতো ঋণ নেই, তাহলে জানাজার নামাজ পড়িয়ে দিতেন। অন্যথায় তিনি পড়াতেন না। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনের আত্মার ঋণের কারণে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে। জান্নাতে যেতে পারবে না’। আমরা নিজেকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরিবর্তন করে আল্লাহর রেজামন্দি হাসিল করব। মিথ্যা বলা, অন্যকে ক্ষতি করা, গিবত, চোখলখুরি, হিংসা, অহংকার থেকে মুক্ত থেকে জীবনকে সাজাব। হে আল্লাহ, এমনভাবে জীবনকে গুছিয়ে দেও, আমার মৃত্যুর পর জানাজার নামাজে দশে অশ্রু ফেলে দোয়া করে। আমিন।