মার্কিন তাড়া খাওয়া তেল ট্যাংকার পাহারায় রাশিয়ার নৌবহর
আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর তাড়া খাওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে পাহারা দিতে সাবমেরিনসহ নৌযান মোতায়েন করেছে রাশিয়া। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ইরানি তেল পরিবহনের অভিযোগ থাকা জাহাজটি বর্তমানে আইসল্যান্ড ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
জাহাজটির আগের নাম ছিল ‘বেলা–১’। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মারিনেরা’।
এটি গায়ানা থেকে রাশিয়ার পতাকায় পুনঃনিবন্ধিত হয়েছে। অতীতে জাহাজটি ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিবহন করলেও বর্তমানে এটি খালি রয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ ও প্রস্থানকারী নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে ‘অবরোধ’ আরোপের নির্দেশ দেন। সে সময় ভেনেজুয়েলা সরকার এই পদক্ষেপকে ‘চুরি’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে নিশ্চিত করেছেন, মারিনেরাকে নিরাপত্তা দিতে রাশিয়া একটি সাবমেরিনসহ একাধিক নৌযান পাঠিয়েছে। এর আগে গত মাসে ক্যারিবীয় সাগরে জাহাজটি ভেনেজুয়েলার দিকে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করা হলে মার্কিন কোস্ট গার্ড সেটিতে উঠতে চেষ্টা করে। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে জাহাজটি জব্দ করার জন্য তখন তাদের কাছে পরোয়ানাও ছিল।
এরপর হঠাৎ করেই জাহাজটি দিক পরিবর্তন করে ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি সামরিক পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার ইউরোপীয় অঞ্চলে পৌঁছায় বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি ‘গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ’ করছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমানে আমাদের জাহাজটি রুশ ফেডারেশনের রাষ্ট্রীয় পতাকা বহন করে উত্তর আটলান্টিকের আন্তর্জাতিক জলসীমায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের পূর্ণ অনুসরণে যাত্রা করছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কেন এই রুশ জাহাজটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী অতিরিক্ত এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ নজরদারি চালাচ্ছে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। এটি একটি শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ।
এরই মধ্যে সিবিএস নিউজকে দেওয়া মন্তব্যে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজটি ডুবিয়ে না দিয়ে দখলে নেওয়ার পক্ষেই বেশি আগ্রহী।
বিবিসি ভেরিফাই রাশিয়া টুডের প্রকাশিত একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে, যা নাকি ট্যাংকারটির ভেতর থেকে ধারণ করা। সেখানে দূরে একটি জাহাজ দেখা যায়, যার অবয়ব মার্কিন কোস্ট গার্ডের লেজেন্ড শ্রেণির কাটারের সঙ্গে মিলে যায়।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের তথ্যমতে, জাহাজ পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের এআইএস ডেটা অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত মারিনেরা আইসল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে উত্তর আটলান্টিকে অবস্থান করছিল। আগের ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, গত দুই দিনে এটি যুক্তরাজ্যের পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত রয়েছে। পোস্টে বলা হয়, আমাদের নৌবাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সন্দেহভাজন জাহাজ পর্যবেক্ষণে সক্ষম। নির্দেশ এলে আমরা সেখানে থাকব।
যুক্তরাজ্য থেকে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রের অবগত করতে হবে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্য দেশের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের পতাকা বহনকারী জাহাজ সেই দেশের সুরক্ষার আওতায় পড়ে। তবে শুধু নাম বা পতাকা বদলালেই সবকিছু বদলে যায় না বলে মন্তব্য করেছেন সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক দিমিত্রিস আমপাতজিদিস।
বিবিসি ভেরিফাইকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তার আইএমও নম্বর, মালিকানা কাঠামো ও নিষেধাজ্ঞার ইতিহাসের ভিত্তিতে; রং বা পতাকার ওপর নয়।
উইন্ডওয়ার্ডের সামুদ্রিক বিশ্লেষক মিশেল বকম্যান জানান, রাশিয়ার পতাকায় নিবন্ধন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি আরও জটিল করে তুলতে পারে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রহীন জাহাজে ওঠার বিধান থাকলেও রুশ পতাকা থাকায় মারিনেরা সেই ক্যাটাগরিতে পড়ে না।
তিনি আরও জানান, যাত্রাপথে হঠাৎ পতাকা পরিবর্তন সাধারণত ‘ডার্ক ফ্লিট’ ট্যাংকারগুলোর ক্ষেত্রেই দেখা যায় এবং এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
এই উত্তেজনার মধ্যেই সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে তাকে এবং তার স্ত্রীকে আটক করতে শহরে সামরিক হামলাও চালানো হয়।
মাদুরো আটক হওয়ার পর থেকে বিবিসি ভেরিফাই তিনটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাংকারকে রাশিয়ার পতাকায় নিবন্ধিত হতে দেখেছে, যার একটি হলো মারিনেরা।
স্কিপার নামের একটি ট্যাংকার জব্দ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯টি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী জাহাজ রুশ নিবন্ধনে চলে গেছে বলে শনাক্ত করেছে বিবিসি ভেরিফাই। এসব জাহাজের অনেকগুলো আগেও ভুয়া পতাকা ব্যবহার করে চলাচল করেছিল।