ভোট উৎসব : উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার সঙ্গে আছে নানা প্রত্যাশা
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ এবার অবাধ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচনকে ঘিরে তরুণ ভোটারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত তরুণ প্রজন্মের অনেকে এবার জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছেন।
শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ নির্বাচন ছিল তাদের কাছে আনন্দের, আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এ নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রত্যাশা।
সার্বিকভাবে ভোটারদের প্রত্যাশা- একটি কার্যকর সংসদ, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং স্থিতিশীল অর্থনীতি। তরুণরা চান কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের সুযোগ, কৃষকরা চান ন্যায্যমূল্য ও ভর্তুকি, শ্রমিকরা চান ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তা, আর সাধারণ মানুষ চান দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন।
ভোটারদের বিশ্বাস, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এবং দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী করতে কাজ করবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, এ বছর জনগণ তাদের পছন্দের মার্কায় সরাসরি ভোট দিতে পেরেছেন। কেউ অন্য কারো ভোট দিতে পারেনি। এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য স্বচ্ছ ও নিরাপদ ভোট প্রদানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো ভোট দিলাম। এখন তরুণদের প্রত্যাশা যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদা আফরিন বলেন, ‘ভোটার হওয়ার পর এবারই প্রথম ভোট। নতুন সরকারের কাছে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছি।’
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্ম এতদিন ভোটের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব একটা পায়নি। এবার ভোট দিয়ে মনে হয়েছে আমরা রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হলাম।’
আজিমপুরের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। সবচেয়ে আনন্দের খবর হলো, ভোট প্রদানের সময় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো ভোট। দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনে অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে। আশা করি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরবেন।’
রাজধানীর মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম (৫৫) বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আগের কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। এবার নিজের ভোট নিজে দিতে পেরে নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এটা যে কতটা আনন্দের বলে বুঝানো যাবে না।’
শান্তিনগর এলাকার ভোটার সালমা খাতুন (৪২) বলেন, ‘আমার দুই সন্তান এবার প্রথমবার আমাকে ভোট দিতে যেতে দেখেছে। আমি তাদের বলেছি ভোট দেওয়া আমাদের নাগরিক অধিকার। দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে হলে ভোট দেওয়া জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক বছর পর ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে। আমরা চাই নতুন সরকার সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝবে এবং দেশকে এগিয়ে নেবে।’
বাড্ডার সাতারকুল এলাকার অটোরিকশা চালক আবদুল কাদের বলেন, ‘সকালে গাড়ি বের করার আগেই পরিবার নিয়ে ভোট দিয়েছি। আমরা চাই নতুন সরকার সব জিনিসের দাম কম রাখবে। যাতে আমাদের কষ্ট কম হয়। অনেকদিন পর ভোট দিতে পেরে আনন্দ লাগছে।’
ভোট দিতে দেশে আসা প্রবাসী জামান আক্তার (৩৮) বলেন, ‘বিদেশে থেকেও দেশের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ ছিল। এবার শুধু ভোট দেওয়ার জন্য দেশে এসেছি। দেশের মাটিতে ভোট দিতে পেরে গর্বিত। আমরা চাই নতুন সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।’
পেশায় চিকিৎসক মির্জা মো. আসাদুজ্জামান রতন বলেন, ‘ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘ সময় পর ভোট দিতে পেরে আনন্দিত। নতুন সরকারের কাছে স্বাস্থ্যখাতে কাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যাশা করছি। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত হাসপাতাল ও চিকিৎসক সংকট দূর হলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ তৈরি হবে।’