নাহিদ রানার আগুনে বোলিংয়ে পুড়ল পাকিস্তান
ম্যাচ শুরুর আগে বেশ আলোড়ন মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে। দেশের মাঠে বছরের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথম ম্যাচে মাঠে এলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক। একটু পরে খেলা দেখতে এলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। বিসিবি কর্তাদের ছুটোছুটি দেখা গেল, চারপাশে একটু শোরগোল। কিন্তু উপলক্ষ যখন ক্রিকেট, তখন ক্রিকেটাররা তো আর আড়ালে থাকতে পারেন না। খেলার শুরুর পর ক্রমে সব আলো কেড়ে নিলেন নাহিদ রানা। তার পাশে ম্লান যেন সবকিছুই।
গতি আর বাউন্সে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে আতঙ্ক ছড়িয়ে যেন ধ্বংসযজ্ঞ চালালেন নাহিদ। তরুণ পেসারের বিধ্বংসী বোলিংয়ে বড় জয়ে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ।
তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিতে পাকিস্তানিদের ৮ উইকেট হারাল মেহেদী হাসান মিরাজের দল।
১০০ ওভারের ম্যাচ শেষ ওভারেই। যে ম্যাচ এমনিতে শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টার আশেপাশে, সেই খেলা শেষ ইফতারের আগেই!
মিরপুরে বুধবার টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তান শুরুটা করেছিল বেশ ভালোই। দশম ওভারে আক্রমণে আসেন নাহিদ। তার প্রথম স্পেলেই পাকিস্তানের ব্যাটিং রূপ নেয় অনেকটা ধ্বংসস্তুপে।
প্রথম ওভারেই দলকে এনে দেন তিনি প্রথম ব্রেক থ্রু। সেই পধ ধরে ছুটে প্রথম পাঁচ ওভারের প্রতিটিতেই শিকার করেন উইকেট!
তার সঙ্গে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ বোলিংয়ে ১১৪ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। রান তাড়ায় তানজিদ হাসানের ঝড়ো ফিফটিতে বাংলাদেশ জিতে যায় ২০৯ বল বাকি রেখে।
উইকেটে ঘাসের ছোঁয়া ছিল বটে, তবে খুব ভয়ঙ্কর কিছু ছিল না। টস জিতে শাহিন শাহ আফ্রিদি বলেছিলেন, ২৭০-২৮০ রান করতে চান তারা। কিন্তু তাদের জন্য বিভীষিকা হয়ে এলেন নাহিদ। ক্যারিয়ারের আগের পাঁচ ওয়ানডেতে তার মোট উইকেট ছিল পাঁচটি। এবার এক ম্যাচেই তার প্রাপ্তি ২৪ রানে ৫ উইকেট।
ওয়ানডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এটি। এর আগে পাঁচ উইকেট ছিল কেবল মুস্তাফিজুর রহমানের (৫/৭৫)।
ব্যাটিং লাইন আপে চার অভিষিক্তকে নিয়ে একাদশ সাজায় পাকিস্তান। তাদের দুজন সাহিবজাদা ফারহান ও মাজ সাদাকাত স্থিতধী শুরু এনে দেন দলকে।
প্রথম ৯ ওভারে উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এরপর নাহিদের হাতে বল তুলে দেন মিরাজ। ওভারের চতুর্থ বলে আলগা ডেলিভারিতে চার হজম করেন তিনি। ওভারের শেষ বলে ধরা দেয় উইকেট। সেই বলও মারার মতোই ছিল। কিন্তু গতির কারণেই পয়েন্টে ধরা পড়েন সাহিবজাদা (৩৮ বলে ২৭)।
সেই শুরু। আরেক অভিষিক্ত শামিল হোসেন উইকেট হারান গতি সামলাতে না পেরেই। শুরু থেকে সাবলিল থাকা সাদাকাত (১৮) বিদায় নেন শর্ট বলের তোপে।
পাকিস্তানের অনভিজ্ঞ এই ব্যাটিং লাইন আপে সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন মোহাম্মাদ রিজওয়ান। তার জন্যই সেরা ডেলিভারিটি জমা রাখেন নাহিদ। গতিময় আউট সুইঙ্গার ছুঁয়ে যায় রিজওয়ানের ব্যাটের কানা, উইকেটের পেছনে ভালো ক্যাচ নেন লিটন।
পরের ওভারে আবার শর্ট বলে সালমান আলি আগাকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন তিনি ৫ উইকেট।
টানা ছয় ওভারে ছয় উইকেটও হতে পারত তার। ম্যাচে তার সবচেয়ে গতিময় ডেলিভারিটি (১৪৮.৬) ছোবল দেয় ফাহিম আশরাফের প্যাডে। আম্পায়ার আউট দেননি, বাংলাদেশ রিভিউ নেয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়, আউট ছিলেন ফাহিম।
টানা সাত ওভার বোলিং করে বিশ্রামে যান নাহিদ। এরপর আর বোলিং পাননি।
ততক্ষণে অভিষিক্ত আব্দুল সামাদকে শূন্য রানে ফেরান মিরাজ। পরে হুসাইন তালাত ও শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফেরান তিনি এক ওভারেই।
পাকিস্তানের নবম উইকেটের পতন হয় ৮২ রানে।
শেষ জুটিতে লড়াই করে ৩২ রান যোগ করেন ফাহিম আশরাফ, সেখানে আবরার আহমেদের অবদান ১০ বলে শূন্য।
৩৭ রান করা ফাহিমকে ফিরিয়েই পাকিস্তানের ইনিংস শেষ করেন মুস্তাফিজুর রহমান।
বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন রান এই ১১৪। আগের সর্বনিম্ন ছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেই স্মরণীয় ম্যাচে ১৬১।
রান তাড়ায় সাইফ হাসান (৪) দ্রুত আউট হলেও তানজিদ হাসানের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের রান কাড়তে থাকে তরতরিয়ে। তিনে নেমে দারুণ সঙ্গ দেন নাজমুল হোসেন শান্তও।
৩২ বলে ফিফটি করা শান্ত শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫ ছক্কায় ৪২ বলে ৬৭ রান করে। জয়ের কাছে গিয়ে আউট হন শান্ত (৩৩ বলে ২৭)। লিটন কুমার দাসকে নিয়ে কাজ শেষ করেন তানজিদ।
২০৯ বল রেখে জয় পায় বাংলাদেশ।
এর চেয়ে বেশি বল বাকি রেখে জয় আছে তাদের স্রেফ দুটি- ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২২১ বল রেখে জয়, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৯ বল আগেই জয়।
সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ শুক্রবার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
পাকিস্তান: ৩০.৪ ওভারে ১১৪ (সাহিবজাদা ২৭, সাদাকাত ১৮, শামিল ৪, রিজওয়ান ১০, সালমান ৫, তালাত ৪, সামাদ ০, ফাহিম ৩৭, আফ্রিদি ৪, ওয়াসিম ০, আবরার ০*; তাসকিন ৭-০-২৯-১, মুস্তাফিজ ৪.৪-০-১৮-১, মিরাজ ১০-০-২৯-৩, নাহিদ ৭-০-২৪-৫, রিশাদ ২-০-১০-০)।
বাংলাদেশ: ১৫.১ ওভারে ১১৫/২ (সাইফ ৪, তানজিদ ৬৭*, শান্ত ২৭, লিটন ৩*; আফ্রিদি ৫-১-৩৫-১, ফাহিম ২-০-১৯-০, ওয়াসিম ৩.১-০-২৪-১, আবরার ৩-০-২৫-০, সালমান ২-০-১২-০)।
ফল: বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: নাহিদ রানা।