রমজানের শেষ দশকের ইবাদত
রমজান মাস মূলত আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। কিন্তু এই মাসের শেষ দশক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। কারণ এই সময়েই লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত নিহিত থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি, যে রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দশকে ইবাদতে অধিক মনোনিবেশ করতেন। হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা.) তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশী বেশী ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন। (বুখারি, হাদিস : ২০২৪)
এই দশকে ইবাদতের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক আমলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্তরের গভীর ইবাদতের মধ্যেই এর প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে। আল্লাহর সামনে ভাঙা হৃদয়, বিনয়ী আত্মা, অশ্রুসিক্ত দোয়া; এসবই বান্দাকে তাঁর নৈকট্যের দিকে টেনে নেয়।
তাই রমজানে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ছায়া আশ্রয় পেতে অন্তরকে দুনিয়ার মোহ ও আত্মকেন্দ্রিক কামনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। এটি এমন এক অবস্থা, যখন বান্দার হৃদয় সবকিছু থেকে সরে গিয়ে কেবল আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করে। তার ভয়, আশা, ভালোবাসা ও নির্ভরতা সবই আল্লাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি নিমগ্ন হও। (সুরা মুজ্জাম্মিল, হাদিস : ৮)
উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত, আরবি শব্দ তাবাত্তুল' ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, অন্তরকে দুনিয়ার অস্থায়ী সুখ থেকে সরিয়ে চিরস্থায়ী রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করানো।
তাছাড়া মহান আল্লাহর রহমত ছাড়া বান্দা সম্পূর্ণ অসহায়। বান্দা যখন তার এই দুর্বলতা উপলদ্ধি করে মহান আল্লাহর দরবারে কাকুতি মিনতি করে, নিজের সব অক্ষমতা প্রকাশ করে আত্মসমর্পণ করে, তখন আল্লাহর বিশেষ রহমতের আশা করতে পারে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, আর তুমি নিজ মনে আপন রবকে স্মরণ কর সকাল-সন্ধ্যায় অনুনয়-বিনয় ও ভীতি সহকারে এবং অনুচ্চ স্বরে। আর গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।' (সুরা আরাফ, আয়াত : ২০৫)
পবিত্র কোরআনের আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হতে নিষেধ করেছেন। তাই কখনো শয়তানের প্ররোচনায় ভুল হয়ে গেলেও গাফেল থেকে যাওয়ার সুযোগ নেই। মুমিনের দায়িত্ব হলো, দ্রুত তাওবা করে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করে ফেলা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের উপর আজাব আসার পূর্বেই তার কাছে আত্মসমর্পণ কর।' (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৪)
তাই পবিত্র রমজানের এই গুরুত্বপূর্ণ দশকে ইবাদতে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, রোজা পালনের পাশাপাশি নফল ইবাদতেও মনোনিবেশ করা সময়ের দাবি। রমজানে প্রতিটি রোজাদারকেই শেষ রাতে জাগ্রত হতে হয়, তারা যদি তখন কিছু সময় তাহাজ্জুদে ব্যয় করতে পারে, তাহলে তা তাদের মর্যাদাকে আরেও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ মহান আল্লাহর কাছে রাতের ইবাদতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, যে রাত্রির বিভিন্ন প্রহরে সেজদা ও দন্ডায়মান অবস্থায় বিনয় ও শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে, আর তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে। বল- যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।' (সুরা যুমার, আয়াত : ৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের তাওফিক দান করুন। মহিমান্বিত এই দিনগুলোতে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আল্লাহমুখী হওয়ার অনুশীলনে যত্নবান করুন। আমিন।