ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে খামেনি পুত্র মোজতবা
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির নতুন প্রধান হিসেবে তার বাবার উত্তরাধিকারী হওয়ার দৌড়ে শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, শীর্ষ ধর্মীয় পর্ষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন করবে। পর্ষদ সদস্য আহমদ খাতামি বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ভোটাভুটি করতে চান।
শীর্ষ পদের অন্য দাবিদারদের মধ্যে রয়েছেন দেশ পরিচালনাকারী অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের তিন সদস্যের একজন আলিরেজা আরাফি, কট্টরপন্থী মহসিন আরাকি এবং এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা খামেনির নাতি হাসান খামেনি।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি নির্বাচিত হলে তা হবে একটি বংশানুক্রমিক ক্ষমতার হস্তান্তর। অথচ ২০২৪ সালে তার বাবা খামেনি নিজে এই ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন।
শাহ শাসিত কয়েক শতাব্দীর রাজবংশের পতনের মাধ্যমেই ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব ইরানের পবিত্র মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া মোজতবা খামেনি প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছয় সন্তানের একজন। গত শনিবার তেহরানে যুদ্ধের শুরুর দিকের এক মার্কিন-ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
সরকারি অনুষ্ঠান এবং গণমাধ্যমে মোজতবার উপস্থিতি খুবই কম। এ কারণে পর্দার আড়ালে তার প্রকৃত প্রভাব নিয়ে ইরানি জনগণ এবং কূটনৈতিক মহলে বছরের পর বছর ধরে নানা জল্পনা রয়েছে।
সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সন্তানদের মধ্যে একমাত্র তিনিই কোনো আনুষ্ঠানিক পদ ছাড়াই প্রকাশ্য অবস্থানে রয়েছেন। কাঁচা-পাকা দাড়ি এবং ‘সৈয়দ’ (রাসুলুল্লাহ সা.-এর বংশধর) হিসেবে কালো পাগড়ি পরিহিত এই ধর্মীয় নেতাকে অনেকে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘আসল বস’ হিসেবে মনে করেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক সেনাবাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডসের সঙ্গে মোজতবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৮০-৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ দিকে একটি কমব্যাট ইউনিটে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই এই সম্পর্কের সূচনা।
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ মোজতবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন বলা হয়েছিল, কোনো সরকারি পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত না হয়েও তিনি সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি ছিল, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তার নেতৃত্বের বেশ কিছু দায়িত্ব ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মোজতবা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিলে তার বাবার আঞ্চলিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ দমননীতিকে এগিয়ে নিতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।
বিরোধীরা অভিযোগ করেন, অতি-কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৯ সালে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার পর যে বিশাল বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল তা দমনে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন।
ব্লুমবার্গ নিউজ অর্গানাইজেশনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, মোজতবা খামেনি ১০ কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদের মালিক। বেনামী সূত্র ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে বলা হয়, তেল বিক্রির টাকা কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। করমুক্ত বিভিন্ন দেশে (ট্যাক্স হ্যাভেন) বেনামী কোম্পানি খুলে এই অর্থ দিয়ে ব্রিটেনে বিলাসবহুল বাড়ি, ইউরোপে হোটেল এবং দুবাইয়ে বিপুল সম্পত্তি কিনতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি তেহরানের দক্ষিণে পবিত্র শহর কোমে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ পদমর্যাদা অর্জন করেছেন, যা তার বাবা খামেনি বা বিপ্লবী নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির ‘আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদার নিচে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মোজতবার স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেলও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ওই হামলায় নিহত হয়েছেন। তিনি ইরানের সাবেক এক পার্লামেন্ট স্পিকারের মেয়ে।
এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির যেকোনো উত্তরসূরিই তাদের ‘লক্ষ্যবস্তু’ হবে।
ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর মোট সদস্য সংখ্যা ৮৮। তারা প্রতি আট বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনিকে নির্বাচনের মাধ্যমে এই পর্ষদ এ পর্যন্ত মাত্র একবারই নেতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।