বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ফাল্গুন ২৭ ১৪৩২, ২২ রমজান ১৪৪৭

জাতীয়

সেবা নিয়ে অভিযোগের মধ্যে ফের বাড়ল খুলনায় পানির দাম

 প্রকাশিত: ১১:৩৩, ১১ মার্চ ২০২৬

সেবা নিয়ে অভিযোগের মধ্যে ফের বাড়ল খুলনায় পানির দাম

গ্রাহক সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও নিয়মিতভাবেই পানির দাম বাড়াচ্ছে খুলনা ওয়াসা। গত ১০ বছরে আটবার পানির দাম বাড়িয়েছে খুলনা ওয়াসা।

গত বছর জুনে এক লাফে ১০ শতাংশ দাম বাড়িয়েছিল সংস্থাটি। এর নয় মাস না যেতেই আবারও দাম বাড়ানো হয়েছে পাঁচ শতাংশ। ১ মার্চ থেকে এই দাম কার্যকর হয়েছে। এ নিয়ে গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ।

নতুন দাম অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানি ব্যবহারের জন্য দিতে হবে ১০ টাকা ৩৮ পয়সা। এর সঙ্গে রয়েছে সার্ভিস চার্জ, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট। নগরে ওয়াসার গ্রাহক রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার।

খুলনা ওয়াসা থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি চার টাকা ইউনিট ধরে পানির নতুন মূল্য তালিকা অনুমোদন করে ওয়াসা বোর্ড। ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পানির দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে দাম আরও ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এভাবে আট দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ দর নির্ধারণ করা হয় ৯ টাকা ৮৮ পয়সা। ১ মার্চ থেকে এটি বেড়ে হবে ১০ টাকা ৩৮ পয়সা।

খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, বছর বছর পানির দাম বাড়ানো একপ্রকার অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে খুলনা ওয়াসা। পানির দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করা কার্যকর কোনো সমাধান হতে পারে না। তাছাড়া গ্রাহকসেবা আইন অনুযায়ী সেবার দাম বৃদ্ধির আগে অবশ্যই গণশুনানি করতে হবে। ওয়াসা কখনও এই শুনানি করে না।

“আয় বাড়ানোর জন্য পানির দাম না বাড়িয়ে ওয়াসার উচিত নিজেদের খরচ কমানো। গ্রাহকদের স্বস্তিতে রাখা। পানির দাম নয়, সেবা বাড়ান। এমনিতেই গ্যাসসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে রয়েছে। সেখানে ওয়াসা আবারও পানির দাম বাড়ানোয় নগরবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ল।”

নগরের বয়রা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম লেনিন বলেন, “১৮ বছর ধরে নগরে পানির সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ওয়াসা। নগরবাসীর পানির সংকটে ওয়াসা যে ভূমিকা পালন করছে, তা অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। নগরের অধিকাংশ মানুষের কাছে এখনো পানি পৌঁছে দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ওয়াসার পানি এখনো সুপেয় হয়ে ওঠেনি। এ পানি কোনো কর্মকর্তা খান না। এতে ময়লা থাকে।”

লেনিন বলেন, “একদিকে ওয়াসার পানির দাম বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে বৈদ্যুটিক পাম্প ছাড়া বহুতল ভবনের ট্যাংকিতে ওয়াসার পানি ওঠানো সম্ভব হয় না। ফলে পানি তুলতে ওয়াসাকে একদিকে পানির মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিলও হচ্ছে। এ কারণে ওয়াসার পানিতে নগরের মানুষ সন্তুষ্ট নয়।”

নিরালা এলাকার বাসিন্দা আবদুস সোবহান বলেন, “কয়েক মাস আগে পানিতে ময়লা আসা শুরু হলে ওয়াসায় যোগাযোগ করি। দুদিন পর ওয়াসার কর্মীরা এসে বলেন, সড়কের কাজ করতে গিয়ে ঠিকাদার পানির পাইপ ফাটিয়ে ফেলেছে, তাদের বলেন।

“ঠিকাদারকে জানালে তিনি বলেন, ওয়াসাকে বলেন, ঠিক করে দিতে, খরচ আমি দিয়ে দেব। এই করে সাত-আট দিন দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। সেবা পেতে ভোগান্তি পোহালেও পানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের মনে হয় নিয়ম মানতে হয় না।”

সোনাডাঙ্গা ক্রস রোড এলাকার বাসিন্দা মমতা রানী সাহা ওয়াসার পানির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে পানি শেষ হয়ে যায়। বিকেলে কখনও পাই, আবার কখনও পাই না। মাঝে মাঝে কোনো নোটিশ ছাড়াই পানি বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প উৎস না থাকায় তখন বিপাকে পড়তে হয়।”

মমতা রানী বলেন, তার মত পানি সমস্যায় ভোগেন ওই এলাকার বেশিরভাগ বাসিন্দা। নিয়মিত মূল্য পরিশোধ করলেও পানি নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই তাদের।

তবে খুলনা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, নাগরিক সেবার মান বাড়িয়ে চলেছেন তারা। এরই অংশ হিসেবে পানি সরবরাহের পাশাপাশি নগরে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার কাজ চলমান। এ কারণে শহরের নালা, সড়ক খননের পাশাপাশি টিঅ্যান্ডটি লাইন সংস্কারেও বারবার খনন করা হয়। ফলে অনেক সময়ে ওয়াসার পাইপ ফেটে যায়। তখন পানিতে ময়লা মিশতে পারে।

তবে তা তারা দ্রুত মেরামত করে সমস্যা সমাধান করে থাকেন। তাছাড়া এখন পানির মান আগের থেকে অনেক ভালো।

কিন্তু নগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী নগরের কোনো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। বাসাবাড়ির বর্জ্যপানি নালার পানিতে মিশে যায়। আবার ওয়াসা তাদের পয়োনিষ্কাশন লাইন করতে নগরজুড়ে বছরের পর বছর খোঁড়াখুঁড়ি করছে। এটা চলাচলে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি অর্থের অপচয়। এটা সমন্বয় থাকার দরকার ছিল।

খুলনা ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এম খাদেমুল ইসলাম বলেন, ঢাকা ওয়াসায় প্রতি ইউনিট পানির মূল্য ১৬ টাকা ৭০ পয়সা, চট্টগ্রাম ওয়াসায় ১৮ টাকা। সেখানে খুলনায় প্রতি ইউনিটের দাম মাত্র ৯ টাকা ৮৮ পয়সা। সব বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিকভাবেই পানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) ঝুমুর বালা বলেন, অন্যান্য শহরের তুলনায় খুলনা ওয়াসার পানির দাম কম। সেই তুলনায় ওয়াসার খরচ অনেক বেশি। সরকারের পয়ঃনিষ্কাশনে আইনে রয়েছে বোর্ড অনুমোদন করলে প্রতিবছর পাঁচ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো যাবে। আইন মেনেই দাম বাড়ানো হয়েছে।

২০০৮ সালের ২ মার্চ সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় খুলনা ওয়াসা। তবে কার্যক্রম শুরু হয় মূলত ২০০৯ থেকে। ২০১১ সালের দিকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করে সংস্থাটি।

খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে খুলনা ওয়াসা যখন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বুঝে নেয়, তখন সিটি করপোরেশনে ১০ হাজার নলকূপ ও ৪৮টি উৎপাদক নলকূপ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় নগরের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ পানির সুবিধা পেত।

ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, এরপর ২০১৮ সালে ২৮ শতাংশ মানুষ ওয়াসার পানি সরবরাহের আওতায় আসে। আর বর্তমানে ৭২ শতাংশ মানুষ ওয়াসার পানি সেবার আওতায় এসেছে। নগরের ৪৫ হাজার ২০০ বাড়িতে তাদের পানির সংযোগ রয়েছে।