ভোটার টানতে বিরামহীন প্রচারণা-প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি প্রার্থীদের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সিলেটের ছয়টি আসনেই চলছে বিরামহীন নির্বাচনী প্রচারণা। দিন-রাত সমানতালে প্রার্থীরা ছুটছেন ভোটারদের দোরগোড়ায়। সমাবেশ, পথসভা, উঠান বৈঠকের পাশাপাশি ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা। ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টায় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নানা প্রতিশ্রুতিতে মুখর পুরো জনপদ।
সিলেট-১: মর্যাদাপূর্ণ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রোববারও তাকে ধারাবাহিক প্রচারণায় সক্রিয় দেখা যায়। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যেমন জনগণের পাশে আছেন, নির্বাচনের পরও সেভাবেই পাশে থাকবেন। তিনি নিজেকে ভোটের সময়ের প্রার্থী নন উল্লেখ করে বলেন, মানুষের পাশে থাকার রাজনীতিতেই তিনি বিশ্বাস করেন।
নির্বাচিত হলে প্রতিটি ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখার এবং সমস্যা সমাধানে মাঠে থেকেই কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনো আপস হবে না বলেও জানান।
এ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। রোববার বিকেলে সিলেট সদর উপজেলায় গণসংযোগকালে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর দুঃখ-দুর্দশা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন।
বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও সুরমা নদীর ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষি ও বসতভিটায় ক্ষতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে সুরমা নদী ড্রেজিং এবং টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, জামায়াত স্লোগাননির্ভর রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং জনগণের ট্যাক্সের অর্থ অপচয় হতে দেওয়া হবে না।
এ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফিজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সুমন, বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ট্রাক এবং বাসদের (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্তি দাস।
সিলেট-২: উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগে ভোট চাচ্ছেন লুনা
সিলেট-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও নিখোঁজ সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন। রোববার রাতে ওসমানীনগর উপজেলার মাদার বাজারে অনুষ্ঠিত শেষ জনসভায় তিনি বলেন, এম ইলিয়াস আলী জীবদ্দশায় এই আসনকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
তাঁর নিখোঁজের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্বে থাকলেও গত ১৭ বছরে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। জনগণ দীর্ঘ সময় ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচিত হলে এবং বিএনপি সরকার গঠন করলে ইলিয়াস আলীর উন্নয়ন ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানজনক জীবনযাপনের লক্ষ্যে বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দেন।
এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মুনতাসির আলী (দেয়ালঘড়ি) তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, গণফোরামের মুজিবুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিনও মাঠে রয়েছেন।
সিলেট-৩: সংসদে এলাকার কথা তুলে ধরার অঙ্গীকার
সিলেট-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক নিয়মিত গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক করছেন। তিনি বলেন, সংসদে গেলে দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার মানুষের দাবি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে তিনি দেশবিরোধী আইন ও বিদেশি অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনওয়ারুল হক, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
সিলেট-৪: ধর্মের নামে বিভ্রান্তির অভিযোগ
সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী রোববার দিনব্যাপী গণসংযোগ ও পথসভা করেন। তিনি বলেন, ভোটের নামে জান্নাতের টিকিট বিক্রির চেষ্টা থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একটি গোষ্ঠী ধর্মকে ব্যবহার করে সহজ-সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি বলেন, এ এলাকা থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। এবার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের সময় এসেছে।
এ আসনে জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ এবং গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম মাঠে রয়েছেন।
সিলেট-৫: অবহেলিত জনপদের চিত্র বদলের প্রতিশ্রুতি
সিলেট-৫ আসনে বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, নির্বাচিত হলে জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলাকে একটি আদর্শ সংসদীয় আসনে রূপান্তরের চেষ্টা করবেন। রোববার জকিগঞ্জে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বঞ্চিত। এই বাস্তবতা বদলানো সময়ের দাবি।
এ আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মামুনুর রশিদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনিও এলাকার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রতি দিয়ে যাচ্ছেন। মাঠে রয়েছেন খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থীরাও।
সিলেট-৬: স্বাধীনতার প্রশ্ন, পুলিশকে হুমকি
সিলেট-৬ আসনে বিয়ানীবাজারে জনসভায় বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, একাত্তরে একটি গোষ্ঠী দেশের স্বাধীনতা চায়নি এবং সেই অপশক্তি এখনো সক্রিয়। ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ধানের শীষ উন্নয়নের প্রতীক এবং জনগণের দাবি বাস্তবায়নে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন।
এ আসনে ১১ দলীয় ঐক্য জোট মনোনীত জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনও জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তার এক বক্তব্য ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাকে না জানিয়ে পুলিশ কারও বাড়িতে যেতে পারবে না। তাদের যথেষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। যার বাড়িতে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে, এই প্রমাণ না দেখিয়ে কোনো দারোগা সাহেব তার বাড়িতে যাবে না। আমি ফাইনাল কথা বলে দিলাম।
এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।