কিশোরগঞ্জ-২: রঞ্জন জামায়াতে, ছেলে খেলাফতে, মুক্তিযোদ্ধা ভাই স্বতন্ত্র
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের দুই বারের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছেন। এ নিয়ে এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তার অনুসারীদের অনেকে হতাশ হয়েছেন, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছেন।
ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি হয়ত বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন; হয়ত তাদের মার্কাতেই নির্বাচন করবেন। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না আখতারুজ্জামান।
বরং তার ছেলে শাহরিয়ার জামান রানা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
অপরদিকে আখতারুজ্জামানের বড় ভাই সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুজ্জামান খোকনও স্বতন্ত্র হিসাবে প্রার্থী হয়েছেন। আখতারুজ্জামানের দল জামায়াতে ইসলামী থেকে এখানে প্রার্থী হয়েছেন মাওলানা শফিকুল ইসলাম মোড়ল। তিনি কটিয়াদি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান।
কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে দুজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ হয়েছে। একই পরিবারের একেক জনের একক রাজনৈতিক অবস্থান ও পারষ্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থান এলাকায় বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, আখতারুজ্জামান, যিনি এলাকায় ‘মেজর রঞ্জন’ হিসেবে পরিচিত; তার বেশ প্রভাব রয়েছে। তিনি যখন সংসদ সদস্য ছিলেন তখন এলাকায় উন্নয়ন কাজ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোর কল্যাণে জাতীয়ভাবেও তিনি বেশ পরিচিত। দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার কারণে তাকে তিন দফা বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। কিন্তু এই অবস্থাতেও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এলাকায় আলোচনায় থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক।
আখতারুজ্জামান রঞ্জন বিএনপি প্রার্থী হিসাবে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন) সালে কটিয়াদি আসন থেকে জয়লাভ করেন। এবার তিনি সরাসরি ভোট না করলেও তিনি ভোটের মাঠ ছেড়ে যাননি। তিনি মাঠেই আছেন।
তার বড় ভাই আনিসুজ্জামান খোকনও বিএনপি থেকেই ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-১৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সহসম্পাদক। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আনিসুজ্জামান খোকন ১১ নম্বর সেক্টরে কর্নেল আবু তাহেরের অধীনে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ছাত্রজীবনে ১৯৭০ সালে তিনি সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছিলেন।
পাকুন্দিয়া উপজেলার একজন ভোটার বলছিলেন, “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আখতারুজ্জামানের নিজের ও পরিবারের অবস্থান নতুন করে রাজনৈতিক মাত্রা তৈরি করেছে। কিন্তু এখানকার পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হতে আরও কয়েকটা দিন সময় লাগবে।
“কারণ, এখানে রঞ্জন জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। তার ছেলে আবার খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হয়েছেন। এখন জামায়াত ও খেলাফত দুই দল থেকেই যদি প্রার্থী হয়- তাহলে রঞ্জন কোন দিতে থাকবেন? সাধারণভাবে হয়ত ধরে নেওয়া যায়, জামায়াত জোট থেকে হয়ত খেলাফত মজলিসকে এই আসনটি ছেড়ে দেওয়া হবে।”
বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একজন বলছিলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আখতারুজ্জামান রঞ্জন। সেবার পুলিশের সাবেক আইজি নৌকার নূর মোহাম্মদের কাছে তিনি হেরে যান। তিনি জেলা বিএনপিরও সভাপতি ছিলেন। নানা বিতর্কের পরও বিএনপিতে তার সমর্থক ছিল। কিন্তু জামায়াতে যোগ দেওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে।
এবার সেখানে বিএনপি তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে জেলা কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। তিনি এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি শামছুল আলম সেলিম বলেন, “আপাতত জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়ন দাখিল করে মাঠে কাজ করছেন। তবে জোট থেকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
“আশা করা যায়, অচিরেই বিষয়টি ফয়সালা হবে। আমরা জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে এখানে প্রথমে শফিকুল ইসলাম রুহানি প্রচার চালান। কিন্তু পরে সেখানে শাহরিয়ার জামানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ জেলা কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাওলানা আব্দুল মোমেন শেরজাহান বলেন, “জোট থেকে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে শাহরিয়ার জামানের (রানা) মনোনয়ন প্রাপ্তির ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জোট থেকে আমাদের দলের প্রার্থীকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হবে।”
নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনিসুজ্জামান খোকন বলেন, “রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টির জন্যই আমি নির্বাচনে এসেছি। জিয়াউর রহমানের সময় আমি নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলাম। জিয়ার মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও আমার ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে আমি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাই, তবে দীর্ঘ ৪০ বছরেও আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করিনি।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শাহরিয়ার জামান বলেন, “কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে আমি মনোনয়ন পেয়েছি। নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। বড় চাচা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন। তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি নির্বাচন করতেই পারেন। একই পরিবারের দুজন প্রার্থী হওয়াকে সমস্যা হিসাবে দেখছি না। ভোটাররা যাকে রায় দেবে সেটা মেনে নেব।”
বিএনপি ছেড়ে সদ্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া আখতারুজ্জামান বলেন, “আমি নিজে এবার নির্বাচন করছি না। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যে কেউ নির্বাচন করতে পারে। সে হিসাবে আমার ছেলে ও ভাই নির্বাচন করছেন- এটি দোষের কিছু না।”
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হিসাব অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে মোট ভোটার প্রায় চার লাখ ৯৪ হাজার। নারী ও পুরুষ ভোটার প্রায় সমান। এখানে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন পাঁচজন।
আসনটি স্বাধীনতার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শুধু কটিয়াদি উপজেলা নিয়েই গঠিত ছিল। এরপর পাকুন্দিয়া উপজেলাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির হাবিবুর রহমান দয়াল, ২০০১ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ডা. আবদুল মান্নান, ২০১৪ সালে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নূর মোহাম্মদ ও ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে গণঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি ও জেলা সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মুফতি আবুল বাশার রেজওয়ান, খেলাফত মজলিশের মাওলানা ছাঈদ আহমদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা রশীদ আহমদ জাহাঙ্গীর হোসাইনী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আবু সাঈদ।