হালাল জীবিকার সন্ধান ফরজ ইবাদত
একজন মুসলিমের জীবনে হালাল রুজি উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মুসলিম জীবনে আমলের পবিত্রতা, ইবাদত কবুল হওয়া, তার সম্পদে বরকত, এমনকি আখিরাতের জীবনে সফলতা হালাল রুজির ওপর নির্ভর করে। ইসলামে হালাল উপার্জনের অর্থ হলো বৈধ আয় বা রুজি। ওই বৈধ জিনিস, যা নিষেধাজ্ঞার বন্ধন হতে মুক্ত এবং শরিয়ত যে কর্মের প্রতি অনুমোদন দেয়, তা-ই হলো হালাল।
হাদিসের পরিভাষায়, ‘আল্লাহ তাঁর কিতাবে যেসব জিনিস হালাল করেছেন তা হালাল এবং যেসব জিনিস হারাম করেছেন তা হারাম। আর যেসব জিনিস সম্পের্কে তিনি নীরব থেকেছেন তা তিনি ক্ষমা করেছেন।’ (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস : ১৭২৬) মনে রাখতে হবে, সত্পথে উপার্জিত রিজিক মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পূর্ব শর্ত।
হালাল রুজি সন্ধান করা ফরজ
হালাল পথে জীবিকা উপার্জনকে ইসলামে অত্যন্ত সম্মানের কাজ বলে গণ্য করা হয়েছে। এটি একটি ফরজ ইবাদত। পবিত্র কুরআনে হালাল জীবিকা গ্রহণের জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা পৃথিবী থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৮)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে রাসুলরা! তোমরা পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো এবং নেক কাজ করো।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৫১)
আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সা.) হালাল জীবিকাকে ফরজ ইবাদত বলে গণ্য করেছেন। আবদুল্লাহ বিন মাসুদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হালাল জীবিকার সন্ধান করা ফরজ ইবাদতের পরই ফরজ (অপরিহার্য কর্তব্য)।’ এর অর্থ হলো, হালাল জীবিকা অর্জনের জন্য যে কর্মপ্রচেষ্টা, গুরুত্বের প্রশ্নে নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি অপরিহার্য (ফরজ) ধর্মীয় ইবাদতগুলোর পরই তার স্থান।
হালাল উপার্জন জেহাদের সমতুল্য
মহানবী (সা.) হালাল উপার্জনকে জেহাদের সাথে তুলনা করেছেন। কাব ইবনে আজরা (রা.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একবার নবীজি (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে বসেছিলেন। এমন সময় এক সাহাবি আমাদের সামনে দিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে গেল। তার ব্যস্ততা দেখে কোনো কোনো সাহাবি আফসোসের সুরে বলেন, ‘আহারে লোকটার এই ব্যস্ততা যদি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদের জন্য হতো, তা হলে কতই না ভালো হতো।’
এ কথা শুনে মহানবী (সা.) বলেন, ‘সাহাবিরা শোন! তার তত্পরতা যদি নিজের সন্তানের জন্য হয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে। অথবা তার ব্যস্ততা যদি মা-বাবার জন্যও হয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে। কিংবা সে যদি হালাল উপার্জনের জন্য বের হয়ে থাকে তাহলেও সে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদরত অবস্থায় আছে।’ (আল মুজামুল আওসাত : ৮৬১৯)
পবিত্র কোরআনেও হালাল রিজিক অন্বেষণকে জেহাদের সমতুল্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ জানেন, তোমাদের কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সম্পদ সন্ধানে (জীবিকা উপার্জনে) দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করবে আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে ব্যস্ত থাকবে।’ (সুরা মুজাম্মিল, আয়াত : ২০)
হালাল রুজি ইবাদত কবুলের শর্ত
হালাল পথে জীবিকা উপার্জন করা এবং তা ভক্ষণ করা ছাড়া ইবাদত কবুল হয় না। সাইয়েদ বিন ইয়াজিদ (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি গুণে ইলমের পূর্ণতা রয়েছে। আর তা হলো আল্লাহকে চেনা, হক বুঝা, আল্লাহর জন্য ইখলাসপূর্ণ আমল করা, সুন্নাহ মোতাবেক আমল ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা। আর এর একটিও নষ্ট হলে ইবাদত বা আমল কবুল হবে না।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ২০৮)
হারাম উপার্জনকারীর জন্য জাহান্নাম
হালাল রুজির সন্ধান এবং ভক্ষণ করা যেমনি জান্নাতে পাবার পথকে সহজ করে, তেমনি হারাম উপার্জন এবং সেই উপার্জন দিয়ে বস্তু ভক্ষণ করাকে জাহান্নামে প্রবেশের পথ বলে উলেস্নখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে দেহের গোশত হারাম মালে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম মালে গঠিত দেহের জন্য জাহান্নামই সমীচীন।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস : ২৭৭২)
অন্য হাদিসে রাসুল (সা) বলেন, ‘হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ : ২৭৮৭)
স্বহস্তে হালাল উপার্জনের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ
হালাল জীবিকা উপার্জন করা মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ করা হয়েছে। আর এই বৈধ উপার্জন স্বহস্তে করার মর্যাদা ও ফজিলত রয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বহস্তে উপার্জিত হালাল রিজিক আহার করল, সে বিদ্যুত্গতিতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বহস্তে পরিশ্রম করে হালাল রিজিক আহার করল, তার জন্য জান্নাতের দরজাগুলো খোলা থাকবে। সে যেই দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।’ মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বহস্তে পরিশ্রম করে জীবিকা উপার্জন করে জীবন ধারণ করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান এবং তাকে কখনও শাস্তি দেবেন না।’
রিজিক হালাল হওয়ার শর্ত
মানুষ জীবনে যা যা ভোগ করে তার সবই রিজিক। হালাল রিজিক ইবাদত কবুলের প্রধান শর্ত। আর রুজি হালাল না হলে মানুষের জীবনই বৃথা। কেননা, রিজিক হালাল বা বৈধ না হলে আখিরাতের জীবনে জান্নাত লাভ করা অসম্ভব। তাই দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর যাবতীয় ফরজ ইবাদত ও অন্যান্য আদেশ নিষেধ পালন করার পাশাপাশি বৈধ পন্থায় জীবিকা উপার্জনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, রিজিক পবিত্র বা হালাল হবে কিভাবে।
রিজিক হালাল হওয়ার দুটি শর্ত রয়েছে। প্রথমত, ব্যবহার্য, ভোগ্য বস্তু বা বিষয়টি হালাল বা ইসলামে শরিয়তে অনুমোদিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, রিজিক অর্জনের পথ বা মাধ্যম হালাল বা বৈধ হতে হবে। এই দুয়ের কোনো একটির ব্যতয় ঘটলে ওই রিজিক হালাল হবে না।
তাই আমাদের যাবতীয় হারাম জীবিকা ও হারাম উপার্জন-যেমন সুদি কারবার, সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা, ওজনে কম দেওয়া, ঘুষ খাওয়া, চুরি ও ডাকাতি করা, বেচাকেনায় প্রতরণা করা ও মিথ্যা শপথ করাসহ যাবতীয় হারাম ও নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বিরত থাকা জরুরি।
কারণ, পরকালে মানুষের উপার্জিত সম্পদ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘আখিরাতে মানুষের পা একবিন্দুও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না সে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেবে। তার মধ্যে দুটি হলো, সে কোন পথে অর্থ বা জীবিকা উপার্জন করেছে এবং কোন পথে তা ব্যয় করেছে।’
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল জীবিকা উপার্জনের তাওফিক দান করুন।