বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের আবার হারিয়ে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়
বিভীষিকা নাকি দুঃস্বপ্ন? অস্ট্রেলিয়া হয়তো বুঝতে পারছিল না কিছুই। ওয়ানডে ইতিহাসে ১ হাজার ২৪ ম্যাচ খেলেও এমন অভিজ্ঞতা যে তাদের হয়নি আগে কখনোই! শূন্য রানে তিন উইকেট হারিয়ে তারা ছিল যেন হতভম্ব। এরপর অবশ্য লড়াই কিছুটা করল তারা। কিন্তু জয়ের নেশায় ছুটতে থাকা প্রতিপক্ষকে থামানোর উপায় জানা ছিল না বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। বল হাতে অসাধারণ সেই শুরুর পথ ধরে আরও একটি দারুণ জয়ে বাংলাদেশ পেল ঐতিহাসিক সাফল্য।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুটিতেই সিরিজ জয় নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে যে দলের বিপক্ষে জয় ছিল না ২১ বছর ধরে, সেই দলের বিপক্ষে এবার প্রথমবার সিরিজ জয়েও স্বাদও ধরা দিল।
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারাল বাংলাদেশ।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়া ৪২ ওভারে ৮ উইকটে ১৮৭ রান করার পর বৃষ্টিতে বন্ধ হয় খেলা। পরে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২। সেই রান দাড়ায় জিতে যায় তারা ৩৬ বল বাকি রেখেই।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমেই শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার বিভীষিকা। আগের ম্যাচে তাসকিনের প্রথম বলে বোল্ড হওয়া ম্যাথু শর্ট এবার টিকতে পারেন তিন বল। পরের ডেলিভারি তিনি না খেলে ছেড়ে দেন, অনেকটা ভেতরে ঢুকে বল ছোবল দেয় স্টাম্পে।
সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই আরেকটি ধাক্কা। পরের ওভারে মুস্তাফিজের প্রথম বলেই কিপারের হাতে ধরা পড়েন কুপার কনোলি।
অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারের শূন্য রানে বিদায়ের মাত্র তৃতীয় ঘটনা এটি। একটু পরে সেটিই হয়ে ওঠে প্রথম এক নজির। ওভারের শেষ বলে কিপারের কাছেই ক্যাচ দেন ম্যাট রেনশ।
স্কোরকার্ডের চিত্র তখন অভাবনীয়, ২ ওভার শেষে ০/৩!
প্রথম রানটি অস্ট্রেলিয়া পায় নো বল থেকে। হতভম্ব অস্ট্রেলিয়া একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল পরের সময়টায়। কিন্তু অষ্টম ওভারে অ্যালেক্স কেয়ারিকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে উল্লাসের উপলক্ষ এনে দেন মুস্তাফিজুর রহমান।
২৫ রানে ৪ উইকেট হারানো দলের হয়ে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন জশ ইংলিস। নাহিদ রানার টানা দুই বলে চার ও ছক্কা মারেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক। পাওয়ার প্লে শেষে বাঁহাতি স্পিনার তানভির ইসলামকে ছক্কায় স্বাগত জানান ক্যামেরন গ্রিন।
ইংলিসকে (৩৪) ফিরিয়ে ৪৩ রানের এই জুটি ভাঙেন তানভিরই। এই বাঁহাতি স্পিনারকে বিশাল একটি ছক্কা মারার পর তাকেই ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন গ্রিন (২৫)।
অস্ট্রেলিয়ার রান তখন ৬ উইকেটে ৮১।
সাতে নামা লাবুশেন ছাড়া বাকি সবাই তখন বোলার। দেড়শ রানের নিচে অস্ট্রেলিয়াকে থামানো ছিল খুবই সম্ভব।
কিন্তু বার্টলেট ক্রিজে গিয়েই দারুণ কিছু শট খেলেন। চার ও ছক্কা মারেন তিনি তাসকিনকে। লাবুশেনও সঙ্গীর ওপর ভরসা পেয়ে আগলে রাখেন আরেক প্রান্ত। গড়ে ওঠে দারুণ এক জুটি।
৪৪ বলে ফিফটি করে ফেলেন বার্টলেট, জুটির শতরান আসে ১১১ বলে।
সপ্তম উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার সপ্তম শতরানের জুটি এটি, বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম।
ফিফটির পর তাসকিনকে সজোরে হাঁকানোর চেষ্টায় বোল্ড হয়ে যান বার্টলেট (৪৮ বলে ৫২)। পরের বলেই দারুণ ডেলিভারিতে অ্যাডাম জ্যাম্পার বেলসও উড়িয়ে দেন অভিজ্ঞ পেসার।
একটু পরই বৃষ্টিতে থেমে যায় খেলা। ৮৫ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত থাকেন লাবুশেন।
২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বন্ধ থাকার পর যখন খেলা শুরু হয়, বাংলাদেশ ধাক্কা খায় শুরুতেই। প্রথম বলেই জোরাল আবেদন থেকে রক্ষা পাওয়া তানজিদ হাসান পরের বলেই ফিরতি ক্যাচ দেন বার্টলেটকে।
তিন বল পর নাজমুল হোসেন শান্তও সুযোগ দিয়েছিলেন। তবে এবার নিজের বলে ফলো থ্রুতে ক্যাচটি নিতে পারেননি বার্টলেট। ওভারের শেষ বলে এলবিডব্লিউয়ের আবেদনে আম্পায়ারের আঙুল উঠে যায়। স্কোরকার্ডে তখন শূন্য রানে ২ উইকেট। ম্যাচের প্রথম ভাগের স্মৃতি ফিরে আসে দ্রুতই! তবে রিভিউ নিয়ে রক্ষা পান শান্ত।
শুরুর অস্বস্তি অবশ্য দ্রুতই বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি আসতে থাকে। শুরুটা হয় সাইফের বদলে একাদশে ফেরা সৌম্য সরকারের ব্যাটে, শান্তও যোগ দেন পরে।
৬ ওভারের মধ্যে ৮টি চার ও একটি ছক্কা আসে দুজনের ব্যাট থেকে।
সেই ধারা ধরে রেখেই আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে এগিয়ে যান দুজন। ১৫ ওভারে রান চলে আসে ৮৫।
দুই ব্যাটসম্যানই ছিলেন ফিফটির কাছে। কিন্তু হয়নি কারও। দুজনই ফেরেন ৪২ রানে।
অনিয়মিত স্পিনার রেনশকে রিভার্স সুইপ খেলে উইকেট হারান সৌম্য। রাইলি মেরেডিথকে কাট করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন শান্ত।
লিটন দাসের (২১) ব্যাটে ছিল ভালো কিছুর ইঙ্গিত। কিন্তু গ্রিনের বাড়তি লাফানো বল তার গ্লাভসে ছোবল দিয়ে চলে যায় কিপারের গ্লাভসে।
আগের ম্যাচের নায়ক মোসাদ্দেক হোসেন উইকেট ছুড়ে দেন তিন চারে ১৫ রান করে।
তখনও প্রয়োজন ৪৮ রান। উইকেটে শেষ স্বীকৃত জুটি। দ্রুত একটি উইকেট হারালে প্রবল বিপাকেই পড়তে হতো। কিন্তু তা হতে দেননি তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া: ৪২ ওভারে ১৮৭/৮ (শর্ট ০, কনোলি ০, ইংলিস ৩৪, রেনশ ০, কেয়ারি ১৩, গ্রিন ২৫, লাবুশেন ৫৫*, বার্টলেট ৫২, জ্যাম্পা ০, এলিস ২*; তাসকিন ৮-১-৩৩-৩, মুস্তাফিজ ৭-২-২৭-৩, নাহিদ ৯-০-৪৫-০, তানভির ১০-০-৪৫-২, মিরাজ ৬-০-৩০-০, মোসাদ্দেক ২-০-৬-০)
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৮৪/৮ (তানজিদ ০, সৌম্য ৪২, শান্ত ৬৭, লিটন ২১, হৃদয় , মোসাদ্দেক ১৫, মিরাজ ৩, তানভির ৫, তাসকিন ২০; বার্টলেট, এলিস ১০-১-৩৮-৩, মেরেডিথ)।
ফল: ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: মুস্তাফিজুর রহমান।