সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ছে ১৩%
নতুন অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর চলমান বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন মন্ত্রী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
সে হিসাবে এবার সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা (১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ) বাড়ানো হয়েছে।
মোট বাজেটের মধ্যে এবার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ খাতে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, সকল নাগরিককে জীবনচক্রভিত্তিক পদ্ধতিতে সুরক্ষার আওতায় আনা, যেন দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
“এই কাঠামোর মূল দর্শন হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা অর্জন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই।”
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
>> সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি’, যার কার্যক্রম সরকার গঠনের ১ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবারের প্রধান নারী ব্যাক্তি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন।
২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম দেশব্যাপী বিস্তৃত করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান এবং এর বিপরীতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন তিনি। তিনি সরকারের গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার কথাও জানান।
>> বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা অব্যাহত রাখা হবে।
>> ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ট্রেনে সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মেট্রোরেল ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।
>> প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৮ লাখে উন্নীত হবে এবং মাসিক ভাতা ১ হাজার টাকা করা হবে।
>> প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভাতা গ্রহীতার সংখ্যা ১ লাখে উন্নীত করা হবে এবং স্তরভেদে মাসিক ভাতা ১,০০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা করা হবে।
>> মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশুকে মাসে ৮৫০ টাকা দেওয়া হবে।
>> ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হবে।
>> বেসরকারি কর্মীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ফান্ডের আওতায় অবসর গ্রহণকালে মোট অর্থের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুইটি হিসেবে দেওয়া হবে।
>> সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ২০ হাজার টাকা অপরিবর্তিত থাকবে।
>> খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের ভাতা ৫ হাজার টাকা করে বাড়িয়ে যথাক্রমে বীরশ্রেষ্ঠ ৪০ হাজার টাকা, বীর উত্তম ৩০ হাজার টাকা, বীর বিক্রম ২৫ হাজার টাকা এবং বীর প্রতীক ২৫ হাজার টাকা করা হবে।
>> জুলাই গণভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিতে আহতদের যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা অব্যাহত থাকবে।
বাজেটে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
একই সঙ্গে নারী, যুবক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংসদে তুলে ধরেন তিনি।
এ লক্ষ্যে নেওয়া নানা পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন; নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করা; ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন; সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ; ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা।
এজন্য স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বাবদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।