পোশাক খাতসহ দেশি শিল্প ‘সুরক্ষায়’ কর ছাড়
টেকসই প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন খাতে কর ছাড়, কিছু ক্ষেত্রে কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে দেশে তৈরির পণ্যের বিপরীতে একই পণ্যের আমদানি পর্যায়ে কর বাড়ানোসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এসেছে নতুন অর্থবছরের বাজেটে।
একইসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের বন্ড সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে।
এর জন্য কর ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় যেসব বাধার মুখোমুখি হতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাও কমানোর প্রতিশ্রুতি মিলেছে বাজেটে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন।
আগামী অর্থবছর ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থের যোগাতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে।
এর মধ্যেই শিল্পখাতে বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “ব্যবসা সহজীকরণের উদ্দেশ্যে শতভাগ রপ্তানিমুখী কমপ্লায়েন্ট পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর বন্ডের অডিটের বাধ্যবাধকতা রহিত করার প্রস্তাব করছি।”
তৈরি পোশাক শিল্পের মতো শতভাগ রপ্তানিমুখী চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং টাওয়েল, লিলেন ও হোমটেক্সটাইল বা ঘরের অন্দরসজ্জা
শিল্প প্রতিষ্ঠানের জেনারেল বন্ডের মেয়াদ এক বছরের স্থলে তিন বছর করার প্রস্তাব করেন তিনি।
একইসঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে এককালীন কাঁচামাল মজুদের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের মেয়াদোত্তীর্ণের অন্যূনতম ৪৮ ঘণ্টা আগে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি গ্রহণের পরিবর্তে ২৪ ঘণ্টার আগেই যেন তা পাওয়া যায় সেই প্রস্তাবও করেন তিনি।
কেবলমাত্র ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করার আইনি বাধ্যবাধকতাও বিলোপ করার প্রস্তাব করেন আমির খসরু।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে অন্যান্য দেশের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কিছু বিধান সংযোজনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের ভেতরে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পণ্য শুল্ক ও কর ব্যতিরেকে আমদানি করে তা সংরক্ষণ, মোড়কজাত, মান অনুযায়ী শ্রেণিকরণ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা সম্ভব হবে বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
যেসব ক্ষেত্রে কর ছাড়
সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স: দেশে বন্ড সুবিধার ‘অপব্যবহার’ রোধকল্পে ‘সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স’ আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
সৌর বিদ্যুৎ: সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশে দেওয়া হয়েছে রেয়াতি সুবিধা। নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ উৎস সৌর বিদ্যুৎ খাতের প্রসারে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে প্রযোজ্য শুল্ক, রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই খাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের স্বার্থে এ সুবিধা ২০৩১ সাল পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
তবে দেশে সৌর বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি অ্যানার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ইত্যাদি পণ্যের রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন তিনি।
ইলেকট্রনিক্স পণ্য: দৈনন্দিন কাজ, বিনোদন, যোগাযোগ বা অফিসের কাজের জন্য ব্যবহৃত যান্ত্রিক সরঞ্জাম বা কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনে শুল্ক ও কর রেয়াতি সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
এর জন্য আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি পণ্য যেমন- মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার কথা বলেন তিনি।
একইসঙ্গে এ খাতে রপ্তানি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
কম্পিউটার ও ডিজিটাল পণ্য উৎপাদন শিল্পেও রেয়াতি সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস খাতের দেশীয় বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে কম্পিউটার, কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের জন্য উপকরণ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক এবং কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প: স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এই শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক, সমুদয় নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আগাম কর আগামী ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
স্মার্টকার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদন শিল্পেও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ১০টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।
কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করছে। এই বিশাল চাহিদাকে সামনে রেখে সব ধরনের স্মার্ট কার্ড ও ব্যাংকিং ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড উৎপাদনে অত্যাবশ্যক ১০টি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
জাহাজ ও ড্রেজার শিল্প: জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য জাহাজ ও ড্রেজার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড়: শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর জন্য এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন আমির খসরু।
ফলে দেশের বাজারে শিশুখাদ্যের দাম হ্রাস পেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সুলভ ও সহজলভ্য হবে বলে দাবি করা হয়।
সাধারণের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় এবং দৈনন্দিন রান্নায় বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। এ বিবেচনায় সব প্রকার মসলার ওপর ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
খেজুর আমদানিতেও ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
কৃষিখাত: কীটনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। দেশে স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এ খাতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট পুরোপুরি মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে জিংক সালফেট সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এর মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করারও প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের পরিবর্তে তার জেনেরিক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়।
কর বসিয়ে ‘দেশি পণ্যকে সুরক্ষা’
কাজুবাদাম চাষ ও উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে পণ্যটি আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়া হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ শতাংশ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।
তবে দেশে উৎপাদকদের অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উপযুক্ত বাজার সুরক্ষার জন্য আমদানিকৃত পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।