ইসলামে মা-বাবার বন্ধুদের সঙ্গে সদাচার
ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তি ও তার ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও স্মৃতিকেও ইবাদতের মর্যাদা দেয়। তাই একজন মা-বাবা শুধু রক্তের সম্পর্কেই সন্তানকে প্রভাবিত করেন না, বরং তিনি রেখে যান বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও সামাজিক সম্পর্কের এক উত্তরাধিকার। তাইতো নবি কারিম (সা.) বলেছেন, ‘বাবার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা সাওয়াবের কাজ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫২)
তাই মা-বাবা ইন্তিকাল করার পরও তাদের প্রতি দায়িত্ব কখনো শেষ হয়ে যায় না—বরং তা এক নতুন রূপে অব্যাহত থাকে। তাদের বন্ধু-বান্ধব, সুহূদ ও প্রিয়জনদের সম্মান করা সেই ধারাবাহিক দায়িত্বেরই অংশ। এ শিড়্গার এক অনন্য দৃষ্টান্ত আমরা পাই মহান সাহাবি ইবনে ওমর (রা.) এর জীবনে। তিনি ছিলেন খলিফাতুল মুসলিমীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সন্তান। ‘একবার মক্কার পথে একজন বেদুইনের সাথে তার দেখা হলো। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তাকে সালাম দিলেন এবং বেদুইনকে তাঁর গাধার ওপর আরোহণ করে নিলেন এবং ইবনে ওমরের মাথার পাগড়ি বেদুইনকে দিয়ে দিলেন। ইবনে দিনার বলেন, আমরা বললাম, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুক। তিনি তো বেদুইন। তারা তো সামান্যতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। (তাহলে এতকিছু দিলেন যে?) আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বললেন, উনার সাথে আমার বাবা ওমর (রা.) এর বন্ধুত্ব ছিল। আর নবিজি (সা.) বলেছেন, বাবার বন্ধুর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা সত্ কাজ।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৭২১)
এক হাদিসে আবু উসাইদ মালিক ইবনু রাবিআহ (রা.) বর্ণনা করে বলেন, ‘একবার আমরা রাসুল (সা.) এর কাছে বসা ছিলাম। তখন বন্ধু সালামা গোত্রের একজন লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, মা-মাবার মৃত্যুর পরে তাদের সাথে সদাচার করার দায়িত্ব বাকি থাকে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তাদের জন্য দোয়া করবে, তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, অঙ্গীকার পূরণ করবে, তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদাচরণ করবে। আর মা-বাবার বন্ধু-বান্ধবীদের সম্মান করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৪২)
আয়শা (রা.) বলেন, আমি খাদিজা (রা.) এর প্রতি যতটকু ঈর্ষান্বিত হতাম, তা নবীজির অন্য কোনো স্ত্রীর বেলায় হতাম না। অথচ আমি খাদিজা (রা.) কে কখনো দেখিনি। কিন্তু নবী কারিম (সা.) বেশির ভাগ সময় তাঁর কথা বলতেন। তিনি যখন কোনো বকরি জবাই করতেন, তখন তার কিছু অঙ্গ কেটে খাদিজার বান্ধবীদের কাছে হাদিয়ারূপে পাঠাতেন। আমি তাঁকে মাঝেসাজে (দুষ্টুমি করে) বলতাম, দুনিয়ার মধ্যে খাদিজার মতো আর কেউ নেই না-কি? তখন তিনি বলতেন, খাদিজা এমন ছিল, খাদিজা এমন ছিল। আর তাঁর থেকেই আমার সন্তানাদি হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৮১৮)
আয়শা (রা.) বলেন, একদা খাদিজার বোন হালা বিনতে খুআইলিদ রাসুল (সা.)-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি কামনা করল। তিনি খাদিজার অনুমতি চাওয়ার কথা স্মরণ করে খুশি হয়ে বললেন, হায় আল্লাহ! (এই দেখি) হালা বিনতে খুআইলিদ!’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৪৮৬৪)
এভাবে প্রিয়জনের বন্ধুদের সম্মান করা ছিল তার হূদয়ের গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন, একবার আমি জারির ইবনু আবদুল্লাহ বাজালি (রা.)-এর সাথে কোনো এক সফরে বের হলাম। তিনি আমার খিদমত করতেন। আমি তাঁকে বললাম, আপনি এমনটা করবেন না। তিনি বললেন, আমি আনসারিদের রাসুল (সা.)-এর সাথে খিদমত করতে দেখেছি। তাই আমি মনে-মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি, আমি তাদের মধ্যে যার সফরসঙ্গী হব, তার খিদমত করব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৪২৮)
অতএব পিতার বন্ধুদের সঙ্গে সদাচার করা মূলত বাবার প্রতি ভালোবাসারই এক নীরব প্রকাশ। এটি যেমন তাঁদের মৃত্যুর পর, তেমনি জীবদ্দশায়ও মা-বাবার সঙ্গে যাদের সখ্য আছে, তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। এটি এমন এক আমল, যার সওয়াব মা-বাবার কবরে পৌঁছে যায়। আজকের আত্মকেন্দ্রিক সমাজে যেখানে সম্পর্ক দ্রুত বিস্মৃত হয়, সেখানে ইসলামের এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মা বাবার মৃত্যুর পর দোয়া করা, তাদের বন্ধু বান্ধবদের সম্মান করা এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখা—সবই ইবাদতের অংশ।