‘হুজুগে’ পাম্পে পাম্পে তেল কেনার হিড়িক
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বৃদ্ধির ‘শঙ্কায়’ ঢাকার জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে ‘হুমড়ি খেয়ে’ পড়েছেন ক্রেতারা।
বৃহস্পতিবার পাম্পগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে, কোনো কোনোটির দীর্ঘ সারি পাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে সড়কেও চলে আসে।
তবে পাম্প কর্মীরা বলছেন, দাম বাড়তে পারে এমন কোনো ‘আশঙ্কা’ বা ‘নির্দেশনা’ এখনো নেই তাদের। ‘হুজুগে’ পড়ে সবাই বাড়তি তেল নিচ্ছেন, এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর চাপ পড়েছে।
ক্রেতাদের তরফে ‘হুমড়ি খেয়ে’ এই বাড়তি তেল নেওয়াকে চাহিদা বলতে নারাজ পাম্প ব্যবসায়ীরা, তারা এটাকে ‘বাড়তি চাপ’ হিসেবেই দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেই পারস্য উপসাগরে ঢোকার একমাত্র এ প্রবেশপথ বন্ধে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার বার্তা দিয়েছে ইরান। যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের বাজারে।
বাংলাদেশে এখনো প্রভাব না পড়লেও সরকারের তরফে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার নিদের্শনা এসেছে।
এদিন দুপুরে মহাখালীর রাওয়া ক্লাব সংলগ্ন ‘ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ’ নামের পাম্পটিতে গিয়ে জ্বালানি নিতে অপেক্ষমান যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
এই পাম্পটিতে সিএনজিচালিত গাড়ি ও অটোরিকশাগুলোর জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে এদিন জ্বালানি তেল বিক্রির অংশেও ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকের বাড়তি ভিড় দেখা যায়।
বিক্রয়কর্মীদের একজন বললেন, সাধারণত এই সময়ে গ্যাসের জন্য গাড়ির চাপ থাকে। কিন্তু কাল রাত থেকে তেলের জন্যও চাপ বেড়েছে।
পাম্প ছেড়ে যানবাহনের লাইন মূল সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় আশেপাশে যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল। সেই জটলা নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে।
রেজাউল করিম নামে পাম্পের একজন কর্মী বলেন, “বেশিরভাগই টাংকি ফুল করতেছে। দাম বাড়তে পারে বা পরে যদি না পায়, সবাই তেল নিতেছে।”
এই পাম্পেই অকটেনের জন্য অপেক্ষমান ইমরান নামে একজন বাইকার বলেন, “নরমালি যখন যা দরকার তখন তেল নেই। ক্রাইসিস পড়তে পারে এই মনে করে ১ হাজার ৮০ টাকায় টাংকি ফুল করে নিলাম।”
শুভ্র নামে আরেক বাইকার বলেন, “এখন না হয় ফুল করে নিলাম, কিন্তু এটাতে আর কতদিন চলবে। ক্রাইসিসে পড়লে পাম্পে আরো ভিড় বাড়বে ভেবেই নিয়ে নিলাম।”
আমতলী এলাকায় ‘গুলশান সার্ভিস স্টেশন’ নামে আরেকটি পাম্পে এসেও দেখা গেল একই অবস্থা। মনির হোসেন নামে এখানকার বিক্রয় প্রতিনিধি বলছেন, তাদের তেল বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত দেড়গুণ বেড়েছে।
“দাম বাড়ে নাই, কিন্তু চাহিদা বাড়ছে। বাঙালি হুতাশে এমন করতেছে, মোটরসাইকেলগুলা বেশি বেশি করতেছে।”
তিনি বলেন, “আগে যেখানে দুইটা গাড়ি আসত, এখন তিনটা আসতেছে। আগে যে ১০ লিটার তেল নিত, এখন ২০ লিটার নিতেছে, এমন আরকি।”
মানুষের এই হুজুগের কথা তুলে পরিস্থিতি ক্রমেই ‘খুব খারাপ’ হওয়ার কথা বলছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস্ অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
তিনি বলেন, “খামোখা মানুষ উত্তেজনা দেখায়ে বাড়তি তেল কিনে শর্টেজ ফেলায় দিচ্ছে। ধরেন, আরো ১৫ দিন চলার মতো তেল আছে, এখন ১০ দিনেই যদি ৫০ দিনের তেল কিনতে আসে সবাই তাইলেতো ভাণ্ডার শেষ হয়ে যাবে।”
চাহিদা কী পরিমাণ বেড়েছে জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী বলেন, “চাহিদা আপনি কোনটাকে বলবেন? একজনের দরকার ১০ লিটার, সে যদি ৫০ লিটার নেয় সেটাতো চাহিদা না। তেলের দাম বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় খামোখা যেটুক প্রয়োজন তারচেয়ে বেশি তেল নিলেতো সেইটা চাহিদা না।
“সেল অনুযায়ী কালকে পর্যন্ত ৬০ পার্সেন্ট বাড়ছে, আজকে এখন পর্যন্ত ৮০ পার্সেন্টে গিয়া ঠেকেছে। এমন চলতে থাকলে হয়তো সন্ধ্যার মধ্যে ডাবল সেল হয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “ধরেন আগে তেল আনতাম ১০ হাজার লিটার, এখন যদি ২০ হাজার লিটার চাই, কোম্পানি কোথা থেকে দেবে? এখন কী পরিমাণ তেল দেবে সেই পরিমাণ সেল দেব, তেল শেষ হইলে সেল বন্ধ করে দেব, কী করার আছে?”
এদিকে বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি সাশ্রয়ে ‘আগাম সকর্কতামূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা বলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ‘বিঘ্ন সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার’ প্রেক্ষাপটে এমন নির্দেশনা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেল সাশ্রয়ে ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার, ‘সম্ভব হলে’ শেয়ারিং (কার-পুলিং) ব্যবস্থা উৎসাহিত করা এবং জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে ‘অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত’ যথাসম্ভব সীমিত বা পরিহার করতে বলা হয়েছে।
সকল সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অফিস চলাকালীন এবং অফিস-পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত জ্বালানির ব্যবহার পরিহার করতে বলা হয়েছে।
করণীয় ঠিক করতে মন্ত্রণালয়ের তরফে বৃহস্পতিবার পাম্প মালিকদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে বলে জানান পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
তিনি বলেন, “আগে এই সময়ে কী পরিমাণ তেল সেল হইতো, সে অনুযায়ী ঠিক করে হয়তো সেভাবেই আমাদেরকে সাপ্লাই দেবে।”