কোরআন তেলাওয়াত জোরে নাকি আস্তে
কোরআনের অবতরণ কেবল শব্দ উচ্চারণের জন্য নয়; বরং তা উপলব্ধি, চেতনার জাগরণ এবং হূদয়ের রূপান্তরের জন্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এ এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সদ, আয়াত : ২৯)
এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, তাদাব্বুরই কোরআনের প্রাণ ও লক্ষ্য।
জেহরি ও সিররি (জোরে ও আস্তে) উভয় ধরনের তিলাওয়াতই নববী সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো কিছুকে তত মনোযোগ দিয়ে শোনেন না, যতটা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এক নবীর সুমধুর কণ্ঠে উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত।’
এ থেকে বোঝা যায়, সুরেলা কণ্ঠে জেহরি তিলাওয়াত এক মহান ইবাদত; এতে আছে আধ্যাত্মিক প্রভাব ও শ্রুতিমাধুর্যের বিশেষ আবেদন।
অন্যদিকে হাদিসে এসেছে—‘যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে কোরআন পড়ে, সে যেন প্রকাশ্যে সদকা করে; আর যে নীরবে পড়ে, সে যেন গোপনে সদকা করে।’
আর এটি সর্বজনস্বীকৃত যে গোপন সদকা রিয়া ও লোকদেখানো মনোভাব থেকে অধিকতর নিরাপদ এবং বহু ক্ষেত্রে বেশি ফজিলতপূর্ণ।
অতএব ইসলামী শরিয়তের দলিল উভয় পন্থাকেই বৈধতা দিয়েছে; কোনো একটিকে চূড়ান্তভাবে আবশ্যিক করেনি।
সালফে সালেহিন তথা পূর্বসূরি আলেমরা এ দুই ধারার মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় তুলে ধরেছেন। বিশেষত ইমাম নববি (রহ.) বিষয়টিকে নৈতিক ও আত্মশুদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, আসল বিবেচ্য বিষয় কণ্ঠের উচ্চতা বা নিম্নতা নয়, বরং অন্তরের অবস্থা। যদি উচ্চস্বরে তিলাওয়াত খুশু, মনোসংযোগ ও ইবাদতের উদ্দীপনা বাড়ায়, এবং তাতে রিয়া, কষ্ট দেওয়া বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকে, তবে তা উত্তম হতে পারে। কারণ এতে অন্যরাও উপকৃত হয় এবং তিলাওয়াতকারীর অন্তরে এক ধরনের সজাগতা সৃষ্টি হয়।
কিন্তু যদি উচ্চস্বরে পড়লে রিয়ার ভয় থাকে, কিংবা নামাজরত ব্যক্তি, ছাত্র, জিকিরকারী, ঘুমন্ত মানুষ বা অসুস্থ কারও বিঘ্ন ঘটে, তবে নীরব তিলাওয়াতই প্রাধান্য পাবে। কেননা ইবাদতের আত্মা হলো ইখলাস এবং কাউকে কষ্ট না দেওয়া।
এ নীতিগত আলোচনাকে যখন আপনার বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনি ধীরে তিলাওয়াত করেন, অনুবাদ পড়েন এবং অর্থ নিয়ে ভাবেন। এতে প্রতীয়মান হয়, আপনার কাছে মূল লক্ষ্য তাদাব্বুর, উপলব্ধি ও হূদয়ের প্রভাব। যদি নীরব তিলাওয়াত আপনার জন্য অধিক খুশু, একাগ্রতা ও আত্মিক নিমগ্নতার কারণ হয়, তবে আপনার জন্য সেটিই উত্তম।
কারণ ইবাদতে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ব্যক্তির অন্তরাবস্থা ও আধ্যাত্মিক উপযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামী শরিয়তের উদ্দেশ্য কেবল বাহ্যিক রূপ নয়; বরং এমন পন্থা গ্রহণ করা, যা মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে।
অতএব বলা যায়, পাঠক জেহরি বা সিররি উভয় অবস্থাতেই সওয়াবের অধিকারী। তবে যে পদ্ধতি তার ইখলাস, তাদাব্বুর ও খুশু বৃদ্ধি করে, সেটিই তার জন্য অধিকতর শ্রেষ্ঠ। আপনি কোরআনকে বুঝে পড়ার যে চেষ্টা করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যদি ধীর ও নীরব তিলাওয়াত এ উদ্দেশ্যে আপনাকে বেশি সহায়তা করে, তবে সেটিই আপনার জন্য উত্তম ও বেশি বরকতময় পথ।