যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’, দাবি মধ্যস্থতাকারীর
সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় উচ্চ-পর্যায়ের পরমাণু আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ অর্জন করেছের বলে ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করলেও যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম এমন কোনো চুক্তিতে দুই পক্ষ পৌঁছাতে পারছে কিনা তা এখনও স্পষ্ট হওয়া যায়নি।
মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা বদর আলবুসাইদি বলেছেন, দেশে ফিরে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার পর দুই পক্ষেরই ফের আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ভিয়েনায় আগামী সপ্তাহে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক হবে।
ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, জেনিভায় আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে; কিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে হলেও অনেক বিষয়ে পার্থক্য বিদ্যমান।
পরের বৈঠক এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে হবে, আরাগচি এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
তেহরান-ওয়াশিংটন আরও আলোচনার এ সম্ভাবনা ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হামলার ঝুঁকিও কমিয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০০৩ সালে হওয়া ইরাক যুদ্ধের পর এবারই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বড় সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। দুটি বিমানবাহী রণতরী, অসংখ্য যুদ্ধবিমান ও জাহাজের পাশাপাশি বিপুল সামরিক সরঞ্জাম ইরানের আশপাশে এনে রেখেছে তারা। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে।
এসব কারণে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে হামলা অবধারিত বলে অনেক বিশ্লেষক ধরেই নিয়েছেন। ওয়াশিংটন এখন আলোচনার নামে কার্যত ‘হামলার সেরা সুযোগ’ খুঁজছে বলেও মত তাদের।
অন্যদিকে ইরান বলেছে, যে কোনো হামলার ভয়াবহ পাল্টা জবাব দেবে তারা।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টার অভিযোগ করে যাচ্ছে। তেহরান শুরু থেকেই এ অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলছে, তারা কোনো অবস্থাতেই বোমা বানাতে চায় না, আর তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ।
যদিও এখন পর্যন্ত ইরানই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন একমাত্র দেশ যাদের কাছে এমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে যা দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্ত্র বানানো সম্ভব।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, জেনিভায় তাদের আলোচকরা ইরানের যে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি অর্জনের অধিকার রয়েছে তা জোরের সঙ্গে তুলে ধরেছেন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ ও তেহরানের কাছে এখন যে ৪০০ কেজির মতো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা ইরানের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা হয়তো কিছু বিষয়ে ছাড়ও দিয়েছেন, যদিও তাদের প্রস্তাব সম্বন্ধে জানা যায়নি।
কিছু প্রতিবেদন বলছে, ইরানের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অধীনে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রেখে এরপর ন্যূনতম মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি চেয়েছে।
চুক্তির বদলে ইরানি আলোচকরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন, ইরানি টেলিভিশনকে এমনটাই বলেছেন আরাগচি। দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রেখেছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ছাড় পেলে ইরানের শাসকরা ফের শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে শঙ্কা মোল্লাতন্ত্রবিরোধীদের।
বৃহস্পতিবার ওমানি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে হওয়া পরোক্ষ আলোচনা দুই পর্বে হয়েছে বলে জানা গেছে। সকালের অধিবেশন চলেছে তিন ঘণ্টা, সন্ধ্যার অধিবেশনের দৈর্ঘ্য ছিল ছোট। আলোচনা কেমন হয়েছে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলেনি।
আগের পর্বগুলোর মতো এদিনের আলোচনাতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পজামাতা জারেড কুশনার। এদিনের আলোচনায় আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও উপস্থিত ছিলেন।
ইরান আগেই বলেছে, তারা কেবল তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা করবে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা তেহরানের ‘প্রক্সিদের’ নিয়েও আলোচনা করতে চেয়েছিল, কিন্তু সে বিষয়েও ইরানের দিক থেকে সাড়া মেলেনি।
মঙ্গলবার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেও ট্রাম্প ইরান নিয়ে ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন। তার ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, কোনো অবস্থাতেই তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অনামা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট সামনের কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী কিংবা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সীমিত আকারে হামলা চালিয়ে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির নেতাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারেন।
আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলে ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে উৎখাতে দীর্ঘ অভিযানেরও নির্দেশ দিতে পারেন বলে প্রতিবেদনগুলোতে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন ওয়াশিংটনকে দীর্ঘ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে—ইরানে এমন হামলা বেশ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ঠেকাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, ইরানে হামলা পুরো অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। তাছাড়া কেবল বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের এখনকার শাসকদের সরানো যাবে না।