কেপ ভার্দেতে ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাস
পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী দ্বীপ রাষ্ট্র দ্য রিপাবলিক অব কেপ ভার্দে। ১০টি প্রধান দ্বীপ ও কয়েকটি ছোট দ্বীপ নিয়ে দেশটি গঠিত। এর মোট আয়তন ৪০৩৩ বর্গ কিলোমিটার। অর্থনীতির প্রধান উত্স পর্যটন, প্রবাসী আয়, বন্দর ও পরিবহন পরিষেবা ও মত্স আহরণ। প্রাইয়া দেশটির সর্ববৃহত্ শহর ও রাজধানী। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে কেপ ভার্দের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। যার বেশির ভাগ খ্রিস্টান। দেশটির মোট জনসংখ্যার ২ থেকে ৩ শতাংশ মুসলিম। কিন্তু আফ্রিকায় ইসলাম প্রচার করে এমন কয়েকটি সংস্থার ধারণা কেপ ভার্দেতে মুসলমানের সংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি। দেশটির মুসলিমদের বেশির ভাগ শহর ও বন্দর এলাকায় বসবাস করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে তারা দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক খাত পর্যটন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ধর্মীয় দিক থেকে কেপ ভার্দের মুসলিমরা সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী।
কেপ ভার্দেতে ইসলামের আগমন হয় খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে। প্রাথমিক যুগে দেশটিতে ইসলামের প্রসার ঘটেছিল মুসলিম ধর্মপ্রচারক সুফি, ব্যবসায়ী ও দাসদের মাধ্যমে। পর্তুগিজ দ্বীপটি দখল করার পর দাস ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে, তখন এখানে মুসলিম দাস ও দাস ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটেছিল। তাদের পাশাপাশি উত্তর আফ্রিকার মুরাবিতরাও (সুফি ধর্মপ্রচারক) এখানে ইসলাম প্রচার করতে আগমন করে। ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ লেখক আন্দ্রে আলভারেস ডে আলমাদার বইয়ে কেপ ভার্দের মুসলিমদের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি উপকূলীয় এলাকার মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের সম্পর্কে লিখেছেন যে, তারা মানুষকে কোরআন শেখায়, তাবিজ দেয় এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যেমন লবণ, হাতির দাঁত, কাগজ, মসলা ও অন্যান্য নিত্যদ্রব্য। কেপ ভার্দের বন্দরগুলোতে মুসলিম ব্যবসায়ীদের একটি জোরালো যোগাযোগ আছে।
কেপ ভার্দেতে পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপনের পর মুসলমানরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মুখে মুসলিমরা তখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ফলে দেশটিতে মুসলিম উপস্থিতিতে ছেদ পড়ে বলেই ধারণা করা হয়। বর্তমানে যেসব মুসলমান কেপ ভার্দেতে আছে তাদের বেশির ভাগ বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে সেখানে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের একাংশ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসার জন্য এসেছে এবং অন্যরা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছে।
কেপ ভার্দের ঔপনিবেশিক শাসকরা কোরআন পাঠসহ সব ধরনের ধর্মীয় আচার-রীতি নিষিদ্ধ করে। তারা ইসলাম পালনের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তি দিত। ধর্মযাজক ফাদার ম্যানুয়েল আলবারেস ১৬১৫ সালে লেখা তাঁর বইয়ে সেনেগাম্বিয়া তথা পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সমাজগুলোকে পর্তুগিজ আধিপত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং মিশনারিগুলোতে তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান। দমন-পীড়ন, নির্বাসন ও ধর্মান্তরের পরও কেপ ভার্দের ভাষা ও সংস্কৃতিতে পশ্চিম আফ্রিকার বহু নিদর্শন থেকে গেছে।
বর্তমানে কেপ ভার্দের মুসলিম পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে। রাজধানী প্রাইয়াতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মসজিদ আছে দেশটিতে। মুসলমানরা রমজানে রোজা রাখার সুযোগ পায় এবং দুই ঈদে ছুটি ভোগ করে। কেপ ভার্দের মুসলিম সমাজের সৌন্দর্য হলো স্থানীয় ও মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়। ২০১৪ সরকার মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনস নামে পাঁচ শ সদস্য বিশিষ্ট একটি সংস্থাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির মুসলিমরা সংখ্যালঘু হিসেবে কর সুবিধা ভোগ করে থাকে।
মূলত ৫ জুলাই ১৯৭৫ পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কেপ ভার্দেতে মুসলমানরা স্বাধীনভাগে ধর্ম পালনের সুযোগ পায়। ১৯৯০ সালে দেশটিতে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে ২০০০ সালে মুসলমানদের সংখ্যা এক শতাংশ অতিক্রম করে এবং ধীরে ধীরে তা বেড়েই চলছে। ধর্ম পালনে স্বাধীনতা থাকলেও মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে মুসলমানরা কঠোর নিয়ম-নীতির মুখোমুখি হয়। আবেদন ও সব শর্ত পূরণ করার পরও দীর্ঘ দিন যাবত সরকারের পক্ষ থেকে মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ আছে। কেপ ভার্দেতে মুসলমানদের সংখ্যা খুব কম হলেও সমাজসেবা মূলক কর্মকাণ্ডে তারা দারুনভাবে তত্পর। সীমিত পরিসরে হলেও তারা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা করে থাকে।
তথ্যঋণ : ইসলাম ওয়েব ডটনেট, দাওয়াহ ডটসেন্টার ও উইকিপিডিয়া