ভোটে টাকার লেনদেন বন্ধে মোবাইল ব্যাংকিং সীমিত, ভোগান্তি
নির্বাচনে অবৈধ টাকা লেনদেন রোধে মোবাইল ব্যাংকিং সীমিত করা হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ইলেকট্রনিক লেনদেন বন্ধ হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে নগদ টাকার লেনদেন এখনও চলছে।
অবৈধ লেনদেন বন্ধ করা যাচ্ছে না-এ ধরনের খবর সামাজিক মাধ্যমে বদৌলতে প্রতিদিনই বাইরে চলে আসছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো সেবাগুলো লেনদেনের জন্য অনিবার্য হয়ে গেছে। অনলাইনে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংক, এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর ছাড়া এখন রোজকার কাজ চলেই না।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে টাকা স্থানান্তর সীমিত করার ফলে লেনদেনে সমস্যা পড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে টাকা স্থানান্তরে অভ্যস্ত মানুষের জীবন থমকে গেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী তানভির আহমেদ দৈনন্দিন খরচের টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রাখেন। প্রয়োজনে টাকা উত্তোলন করেন, খরচ করেন।
সোমবার রাত থেকে টাকা সীমিত করে দেওয়ার কারণে এক হাজারের বেশি টাকা তুলতে পারছেন না। আবার অন্য জায়গা থেকে পাঠাবেন, সেটাও পাঠাতে পারছেন না। ফলে জরুরি কাজ থাকলেও তা লেনদেন করতে পারছেন না।
তানভির বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকার স্থানান্তর না করতে পেরে খুবই সমস্যা হচ্ছে। আগে যখন মোবাইল ব্যাংকিং ছিল না, তখন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাড়িতে বা সঙ্গে রাখতাম।
মোবাইল ব্যাংকিং হওয়ার কারণে এখন টাকা তুলে ঘরে রাখা হয় না। এক হাজারের বেশি টাকা উত্তোলন করতে না পারার কারণে এখন যেন অচল হয়ে গেছি। পকেট খরচ, যাতায়াত, প্রয়োজনে কাউকে দেওয়া বা নেওয়া-কোনোটাই এখন আর করা যাচ্ছে না। কাজে বাইরে যেতে হলে বারবার চিন্তা করে বের হতে হচ্ছে। এতে দৈনন্দিন কাজই থেমে গেছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেন সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার ফলে মিরপুরের আমিরুল ইসলামও সমস্যায় পড়েছেন। আমিরুল ইসলামের গ্রামের বাড়িতে ৫ হাজার টাকা পাঠানোর দরকার। চারবার চার হাজার টাকা পাঠানোর পর আর টাকা পাঠাতে পারছেন না। না পারছেন গ্রামের বাড়িতে আরও এক হাজার টাকা পাঠাতে, না পারছেন মায়ের কাছে ওষুধের টাকা পাঠাতে। আমিরুল এখানে-ওখানে দৌড়াদৌড়ি করছেন কোনোভাবে অন্তত এক হাজার টাকা পাঠানো যায় কি না, কিন্তু কোনোভাবেই পারছেন না। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের কাছেও গেলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
একই সমস্যা হচ্ছে যার কাছে টাকা পাঠানো হচ্ছে তারও। তার কাছ থেকেও মোবাইল ফোনে খবর আসছে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবৈধ টাকার লেনদেন রোধে নির্বাচনের আগে-পরে মিলে ৯৬ ঘণ্টা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তি অ্যাকাউন্টে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বাচনের আগে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টা থেকে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই নির্দেশনা বহাল থাকবে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ সম্পর্কিত একটি নির্দেশনা জারি করে দেশে কার্যরত সব মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পি-টু-পি) ক্ষেত্রে প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা হবে এক হাজার টাকা এবং লেনদেনের সর্বোচ্চ সংখ্যা হবে দৈনিক চারটি। মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং ইউটিলিটি বিলের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত লেনদেনের বিধান অপরিবর্তিত থাকবে।
এ ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের মোবাইল (এমএফএস) লেনদেন বর্ণিত সময়কালে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচন উপলক্ষে এমএফএস-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিটি মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার কর্তৃক নিজস্ব কুইক রেসপন্স সেল গঠন করতে হবে।
উল্লিখিত সময়ে সব প্রকার লেনদেন এমএফএস প্রোভাইডার কর্তৃক সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের (ক্লোজ মনিটরিং) আওতায় আনতে হবে এবং সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় রিপোর্ট করতে হবে।
এ সময়ে পি-টু-পি ইন্টারনেট ব্যাংকিং (আইবিএফটির মাধ্যমে লেনদেন) সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
এমএফএস প্রোভাইডার ও ব্যাংকসমূহ নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাত ১২টার পর স্বাভাবিক লেনদেন যথারীতি পুনর্বহাল হবে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি এবং এজেন্ট সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। দেশে প্রতি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড়ে দুটি করে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো একটি নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। দ্রুত টাকা পাঠানো ও রিসিভ করার সুযোগ থাকা এবং হাতের নাগালে টাকা উত্তোলন বা পাঠানোর সুবিধা থাকার কারণে খুব কম সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। লেনদেনের পাশাপাশি ছোট ঋণের জায়গাও এখন মোবাইল ব্যাংকিং। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার সীমিত করে দেওয়ার ফলে সংকটে পড়েছেন এসব গ্রাহক।
এক হাজারের বেশি টাকা উত্তোলনের সুযোগ না থাকা এবং বেশি টাকা ক্যাশ আউট হলে কে কোন উদ্দেশ্যে তা করবে বোঝা যাবে না-এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। বেশি টাকা উত্তোলন বা পাঠানোর তথ্য প্রশাসন নজরদারি করবে-এই ভয়ে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ এজেন্টগুলোতে আর বেশি টাকা ব্যালেন্স রাখা হচ্ছে না।
যারা অনলাইনে এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করেন তারাও সমস্যায় পড়েছেন। ব্যাংকের এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং থেকে ব্যাংকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে অপশন বন্ধ রেখেছে কোনো কোনো মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। অনলাইনে টাকা ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট হলেও ক্রেডিট হচ্ছে না।
থেমে নেই টাকা লেনদেন
নির্বাচনে টাকা ব্যবহার বন্ধে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমিত করলেও হাতে হাতে টাকা লেনদেন থেমে নেই। প্রার্থী সরাসরি বা প্রার্থীর পক্ষে টাকা দেওয়ার ভিডিওচিত্র প্রতিদিনই সামাজিক মাধ্যমে আসছে। গত দুই দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রথমে ভোট চাওয়ার একটি চিত্র দেখা যায়। প্রথমে ভোট প্রার্থনা করা হয়, তারপর তাকে টাকা দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। পরের আরেকটি চিত্রে অভিযোগ করা হচ্ছে, কয়েকজন মানুষ একটি আহত ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলছেন-একটি রাজনৈতিক দলের লোকজন ভোট কিনতে টাকা দেওয়ার সময় অন্য পক্ষের লোকজন প্রতিবাদ করলে তাকে প্রহার করা হয়েছে, তার একটি চোখও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। খামের মধ্যে টাকা ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন বন্ধের গুজব
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন সীমিত ও অনলাইনে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন বন্ধ হওয়ার পর অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) থেকে টাকা উত্তোলন করা যাচ্ছে না-মর্মে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমত, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা নেই। দ্বিতীয়ত, বুধবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বুথে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রায় সব এটিএম বুথ থেকে নিজ গ্রাহকের টাকা তোলা যাচ্ছে।