ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় নেতৃত্বে দুই মুখ উইটকফ ও আরাকচি
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শুক্রবার মাস্কাটে এক বৈঠকে বসছেন।
গাজা ও ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন স্টিভ উইটকফ আর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের মুখ হিসেবে পরিচিত।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিরোধী গণ-আন্দোলনে দমন-পীড়নে প্রাণহানির ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের মধ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ওই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিলেও পরে তারা আলোচনায় সম্মত হয়।
মাস্কাট থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান আলোচকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে দেওয়া হলো:
উইটকফ: রিয়েল এস্টেট থেকে বিশ্বমঞ্চ
পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান স্টিভ উইটকফ।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি গাজা ও ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী উইটকফ প্রথম আলোচনায় আসেন তখনই, যখন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ট্রাম্প তাকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে স্বল্পস্থায়ী এক যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার কৃতিত্ব দেন।
গত বছর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও অংশ নেন উইটকফ।
তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের কারণে সে আলোচনা হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও অল্প সময়ের জন্য ওই যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিল।
ওই আলোচনাগুলো ওমানে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই উইটকফের সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধি আরাকচির সাক্ষাৎ হয়।
৬৮ বছর বয়সী এই কোটিপতি ট্রাম্পের নিয়মিত গলফ সঙ্গীও। পরে তিনি গাজায় সফরকারী প্রথম মার্কিন কর্মকর্তা হন।
হামাসের ২০২৩ সালের ইসরাইল হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধের পর, এটিই ছিল কোনো মার্কিন কর্মকর্তার প্রথম গাজা সফর।
এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আসে সেই মুহূর্ত। গাজা যুদ্ধ অবশেষে থামানোর চুক্তির পুরো কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
তবে, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নির্ধারণ ও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে মূল ভূমিকা রাখেন উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা ও দূত জ্যারেড কুশনার।
ইউক্রেন ইস্যুতেও আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন উইটকফ। ইরান সংক্রান্ত আলোচনার আগে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সর্বশেষ দফার আলোচনায় অংশ নিতে আবুধাবিতে ছিলেন।
রাশিয়ার বিষয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নীতি থেকে সরে এসে ট্রাম্প ইউটার্ন নেওয়ায় বিতর্কে জড়ান উইটকফ।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের প্রশংসা করায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের জন্য তিনি একাধিকবার মস্কো সফরও করেছেন।
বাইডেন যে যুদ্ধগুলো থামাতে পারেননি, সেগুলো শেষ করাকে ট্রাম্প নিজের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য করেছেন। আর এটা উইটকফকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।
১৯৫৭ সালের ১৫ মার্চ নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস বরোতে জন্ম স্টিভ উইটকফের। রিয়েল এস্টেট খাতে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন। শুরুটা ছিল করপোরেট আইনজীবী হিসেবে। পরে বড় বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৯৯৭ সালে তিনি উইটকফ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পরিচয় দেয়— এক অংশ ডেভেলপার, এক অংশ বিনিয়োগকারী ও এক অংশ নগরদৃশ্য বদলে দেওয়া শক্তি হিসেবে। এই প্রতিষ্ঠানে তার স্ত্রী ও এক ছেলে কাজ করেন।
-আরাকচি: ইরানের পেশাদার কূটনীতিক-
দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ক্যারিয়ার গড়া আরাকচি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির অন্যতম রূপকার ছিলেন। সেই চুক্তি এখন আর কার্যকর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে তিনি জোরালো অবস্থান নেবেন।
৬৩ বছর বয়সী আরাকচির জন্ম কার্পেট ব্যবসায়ী পরিবারে। তিনি ইংরেজিতে সাবলীল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নানা দায়িত্বে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন।
পরিপাটি দাড়ি ও সল্ট এন্ড পিপার চুলের স্টাইলে ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ হিসেবেই তার পরিচিতি। সাধারণত তিনি স্যুট পরেন। সঙ্গে টাই ছাড়া সাদা ম্যান্ডারিন কলারযুক্ত শার্ট।
ইরানি কূটনীতিকদের মধ্যে এটি পরিচিত এক ধরন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ মহলে প্রচলিত ধর্মীয় ভাষা তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলেন। তবু গত মাসে দেশজুড়ে গণ-বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আরাকচি।
আন্দোলন দমনে শীর্ষ নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিলেও আব্বাস আরাকচি সেই অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রে কথা বলেন। এমনকি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটি মতামতধর্মী নিবন্ধও প্রকাশ করেন।
আরাকচি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট থেকে তিনি রাজনৈতিক চিন্তাধারায় ডক্টরেট ডিগ্রি নেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে যোগ দেন।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করেন।
পরে আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আরাকচিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের লক্ষ্যও।
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে আরকচি পশ্চিমা মহলে পরিচিত মুখ। ওই চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা আরোপের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল।
তবে তিনি দায়িত্বে থাকাকালে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
বিশেষ করে গত জুনে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের নিন্দা জানাতে ইউরোপ ব্যর্থ হয়েছে বলে আরাকচি তীব্র সমালোচনা করেন।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
ওই দেশগুলোর অভিযোগ ছিল, ইরান পারমাণবিক চুক্তির শর্ত মানছে না। ওই চুক্তি যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএ নামে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটন একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।