বাংলাদেশের অটল অবস্থান ভালো লেগেছে নাসের হুসেইনের
মুস্তাফিজুর রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের অনড় অবস্থান পছন্দ হয়েছে নাসের হুসেইনের। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোয় পাকিস্তানের প্রশংসাও করেছেন তিনি। এই ধারাভাষ্যকার ও সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়কের মতে, ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাব এখন অতিরিক্ত হয়ে উঠেছে এবং একটা পর্যায়ে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হতো।
বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করার পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে। স্কাই স্পোর্টসে আরেক সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক আথারটনের সঙ্গে আলোচনায় হুসেইন বললেন, ম্যাচ বর্জনই পাকিস্তানের সামনে একমাত্র পথ ছিল।
“বাংলাদেশের নিজেদের অবস্থানে অটল থাকা আমার বেশ ভালো লেগেছে। তারা নিজেদের ক্রিকেটার ফিজের (মুস্তাফিজ) পাশে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানকেও ভালো লেগেছে, যদিও জানি এটা রাজনৈতিক, তবু ভালো লেগেছে বাংলাদেশের পাশে থেকেছে পাকিস্তান। কোনো একটা পর্যায়ে কাউকে তো বলতে হবে, ‘যথেষ্ট রাজনীতি হয়েছে, এখন কি আমরা ক্রিকেট খেলাটায় ফিরে যেতে পারি?”
“কাজেই এটা হতে পারে সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কারণ একমাত্র যেদিক থেকে পাকিস্তান আঘাত করতে পারে আইসিসিকে কিংবা এমনকি ভারতকে, সেটা হলো অর্থ, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের অর্থ দিয়ে। এটিই একমাত্র পথ।”
ক্রিকেটে এখন রাজনীতির প্রবল প্রভাবের সমালোচনাও করেছেন হুসেইন। গত এশিয়া কাপে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেটারদের হাত না মেলানো, এসিসি ও পিসিবি প্রধান এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি না নেওয়া, এসব ব্যাপারও উঠে এসেছে তার কথায়।
“সত্যি বলতে, খুবই হতাশাজনক। ক্রীড়া, ক্রিকেট এবং রাজনীতি সবসময়ই পারস্পারিক জড়িয়ে। ক্রীড়া ও রাজনীতির মধ্যে একটা যোগসূত্র সবসময়ই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই যোগসূত্র ক্রমে বাড়ছে এবং বাড়ছেই।”
“আগে এটা ছিল ব্যতিক্রম, এখন এটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। স্রেফ রাজনীতি ও রাজনীতিবিদরাই নন, এখন ক্রিকেটাররাও…। গত বছর দুয়েকে ক্রিকেটারদের যেভাবে দেখেছি, যেটা বললাম, সত্যিই হতাশাজনক। হাত মেলাচ্ছে না, ট্রফি নিচ্ছে না। ক্রিকেট আগে বিভিন্ন দেশ ও জাতিক একতাবদ্ধ করত, এখন এটি মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করছে।”
মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই যে চলমান সঙ্কটের শুরু, সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন হুসেইন।
“মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক এই সঙ্কট কোত্থেকে শুরু হয়েছে। (মুস্তাফিজুর) রহমান কলকাতার হয়ে আইপিএল খেলছে বা সে স্কোয়াডে ছিল এবং ব্যাখ্যাতীতভাবে হুট করে বিসিসিআই বলল, বাংলাদেশ ও ভারতের চলমান পরিস্থিতির কারণে তাকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে হবে এবং সেই একটি সিদ্ধান্ত থেকেই সবকিছু ছড়িয়ে পড়ল।”
বাংলাদেশের জায়গায় ভারত থাকলে আইসিসি তাদেরকে বাদ দিতে পার কি না, এই প্রশ্ন তুললেন ৫৭ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটর। ইংল্যান্ডের হয়ে ৯৬ টেস্ট খেলা ব্যাটসম্যানের মতে, সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে না বলেই বিশ্ব ক্রিকেটের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
“সত্যিকারের তুলনা হবে এবং সেটিই সত্যিকারের প্রশ্ন, যেটির উত্তর কেবল আইসিসিই দিতে পারে, এখানে যদি ভারত থাকত বা ভবিষ্যতেও যদি কোনো টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাস আগে ভারত বলে, আমাদের সরকার চায় না ওই দেশে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে, তখন কি আইসিসি এতটা শক্ত অবস্থানে থাকবে এবং বলবে যে, ‘নিয়ম আপনার জানা আছে, ব্যাড লাক, আমরা তোমাদের বাদ দিচ্ছি?’ সেটিই একমাত্র প্রশ্ন, সব দলই চায় এই ধারাবাহিকতা।”
“বাংলাদেশকে আপনি যেভাবে দেখবেন, পাকিস্তানকেও সেভাবে দেখতে হবে, ভারতকেও একইভাবে দেখতে হবে। এখন ভারতীয় সমর্থকেরা আরও চিৎকার করতে পারে যে, ‘আমাদের টাকা আছে..”, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও আসে। যদি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকেন, তাদের ক্রিকেট হ্রাস পায়, তাহলে অতীতে ভারত-পাকিস্তানের যে দারুণ লড়াইগুলো আমরা দেখেছি বা ভারত-বাংলাদেশের, তা একতরফা হয়ে ওঠে, যেমনটি হচ্ছে।”
ক্রিকেটে রাজনীতির প্রভাবে একটি ইতিহাসে জড়িয়ে আছেন এই হুসেইনও। ২০০৩ বিশ্বকাপে তিনি অধিনায়ক থাকার সময়ই রাজনৈতিক কারণে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ইংল্যান্ড এবং সেই ম্যাচের দুই পয়েন্ট দেওয়া হয় জিম্বাবুয়েকে। সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ভার দলের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ডের সরকার এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা ছিল হুসেইনেরই। তিনি পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “কখনও কখনও ক্রীড়া ও রাজনীতির সংঘাত হয়, এটি ছিল তেমনই একটি উপলক্ষ।”