শেখ হাসিনার বাইরে গিয়েও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এগোতে পারে: ফখরুল
‘শেখ হাসিনার বাইরে গিয়েই’ ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলছেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের কাজ করা দরকার। তবে একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ‘অবশ্যই ক্ষমা চাইতে হবে’।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে শরিকদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের কথা বলে আসছে বিএনপি। তবে সেই সরকারে জামায়াতে ইসলামী থাকবে না বলে স্পষ্ট করেছেন মির্জা ফখরুল।
সোমবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইকে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে বিএনপির এই অবস্থান তুলে ধরেছেন দলের মহাসচিব।
বিএনপির সংস্কার কর্মসূচি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে কতটা আশাবাদী জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে কার্যত নাগরিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী একটি পুরো প্রজন্ম আছে, যারা কখনো সত্যিকার অর্থে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা পায়নি।
“স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মধ্যে সেই অধিকার প্রয়োগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আমি মনে করি ভোটার উপস্থিতি ভালোই হবে। বড় ধরনের কোনো অস্থিরতা বা গুরুতর বাধা থাকবে বলে মনে করি না, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
ফখরুলের বিচারে, নির্বাচন কমিশন ‘দায়িত্বশীলভাবে’ কাজ করছে এবং সরকারও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ‘আন্তরিক’।
“আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনকালে কিছু সমস্যা থাকেই, তবে সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত করার মত গুরুতর হবে বলে মনে করি না। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছে এবং মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।”
নির্বাচনে জয়ী হলে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের যে কথা বিএনপি বলে আসছে, সে বিষয়ে মির্জা ফখরুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্য ইউক।
জবাবে তিনি আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের সময় বাম ও ডান—উভয় ধারার বেশ কিছু সমমনা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট গড়ে তোলার কথা মনে করিয়ে দেন।
“সব মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৪টি রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সেই সংগ্রামে ছিল। যখন আমরা ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করি, তখন স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—সরকার গঠন করতে পারলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের পাশে থাকা দলগুলোর অংশগ্রহণে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকার হবে। সেই অঙ্গীকার এখনো বহাল আছে। তবে যারা সেই সংগ্রামের অংশ ছিল না, তারা এই সরকারের অংশ হবে না।”
জামায়াতে ইসলামী সেই সরকারে জায়গা পাবে কি না–জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, “না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের কোনো সমঝোতা নেই এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারের অংশ হিসেবে জামায়াতকে আমি দেখি না।”
চব্বিশের অভ্যুত্থানের ছাত্রদের গড়া দল এনসিপির সঙ্গে বিএনপি কেন জোট করল না, সেই প্রশ্নও রাখা হয় মহাসচিবের সামনে।
উত্তরে তিনি স্বীকার করেন, এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনি জোট গড়ার চেষ্টা করেছিল বিএনপি, তবে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে সমঝোতা হয়নি।
“এনসিপি অনেক বেশি আসন দাবি করেছিল, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের প্রার্থীরা ওই আসনগুলোতে জিততে পারবেন। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন প্রতীকে এনসিপির প্রার্থীরা জিতবেন কি না, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক।”
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সবচেয়ে বেশি সময় দেশ শাসন করা দলটি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
সে বিষয়ে এক প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, “আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। দলটি নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে ফিরে আসতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। এখন সে সুযোগও নেই, কারণ শেখ হাসিনা দলের ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ দেন না।”
বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনায় ভারতবিরোধী মনোভাব ‘বেড়ে যাওয়ার’ বিষয়টি তুলে ধরে দ্য উইক জানতে চেয়েছিল, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কোন বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান দরকার?
মির্জা ফখরুল বলেন, “প্রথমত, পানি বণ্টনের বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে সমাধান করতে হবে, শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে হবে—সভ্য কোনো সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
“তৃতীয়ত, বাণিজ্য ইস্যুগুলো ন্যায্যভাবে দেখতে হবে। সাম্প্রতিক ক্রিকেট–সংক্রান্ত ঘটনাটি দুঃখজনক ও অপ্রয়োজনীয় ছিল, যা দুই পক্ষেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক আস্থার কথা মাথায় রেখে এসব বিষয়ে দ্রুত সংলাপ প্রয়োজন।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশ তাকে ফেরত পাঠাতে বললেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি।
দ্য উইক প্রশ্ন করেছিল, আগামী দিনে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে?
জবাবে ফখরুল বলেন, “তিনি একটি ফ্যাক্টর, তবে অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে শেখ হাসিনাই এ সংকট তৈরি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক তার বাইরে গিয়েও এগোতে পারে এবং এগোনো উচিত।”
একাত্তরের কিছু বিষয় অমীমাংসিত থাকার পরও বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের প্রতি ‘নরম’ কি না, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল বিএনপি মহাসচিবের সামনে।
উত্তরে তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতেই হবে—এটাই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে সব প্রতিবেশী দেশের একসঙ্গে কাজ করা দরকার।”