শুক্রবার ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৪ ১৪৩২, ১৮ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে দম্পতি নিহত সামরিক যোগাযোগ পুনরায় শুরুতে সম্মত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ১৮ বছর পর ফের রাষ্ট্রদূত নিয়োগে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও বলিভিয়া ওমানে আলোচনার প্রস্তুতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মবিরতি দুদিন স্থগিত শফিক রেহমান-ববিতাসহ একুশে পদক পাচ্ছেন ৯ ব্যক্তি ও একটি ব্যান্ড দল রোজায় অফিস ৯টা থেকে সাড়ে ৩টা যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্ব হস্তান্তর করবে অন্তর্বর্তী সরকার: প্রেস সচিব পল্লবীর বিহারী ক্যাম্পে ২ শিশুসহ এক পরিবারের ৪ জনের লাশ পোস্টাল ভোটের ফল আগেভাগে জানার সুযোগ নেই: ইসি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা শুক্রবার এরদোয়ান-সিসি বৈঠক : অংশীদারত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর জুলাই হত্যা: আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোয় শাহবাজ শরীফকে আসিফ নজরুলের ধন্যবাদ আন্দোলনের সঙ্গীরাই এখন আমার ওপর মিসাইল ছুড়ছে: জামায়াত আমির তিন লাখ ৮০ হাজার প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট দেশে পৌঁছেছে আধিপত্য বিস্তার: সিলেটে মহাসড়ক আটকে দেড় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ খুলনায় ইসলামী আন্দোলনের নারী কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ অনিশ্চয়তা কাটল, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ‘বৈঠক হচ্ছেই’, আলোচ্যসূচিতে মতভেদ আর্টেমিস ২: চাঁদে মানুষের যাত্রা পিছিয়ে গেল মার্চে বাংলাদেশের অটল অবস্থান ভালো লেগেছে নাসের হুসেইনের

সংস্কৃতি

নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ

অপ্রকাশিত রচনা

 প্রকাশিত: ১১:২৮, ৪ অক্টোবর ২০২০

নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ

আমরা যখন প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন আমাদের জিভের ডগায় নাচত কয়েকটি নাম—শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, আবু রুশদ, গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং শামসুদ্দীন আবুল কালাম। আমাদের এই জগদ্দল সমাজে লেখক হওয়ার যে কী মানে, তা আমি কাগজে-কলম ছুঁইয়েই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই, আমাদের সমাজের এই অগ্রগণ্য লেখকদের সাহিত্যচর্চা বরাবরই আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ঠেকেছে। তাদের সাহিত্য ফসলের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞবোধ করেছি সব সময়। তাই, আমাদের আড্ডায় বার বার ঘুরে-ফিরে উচ্চারিত হতো এ কয়েকটি নাম, উচ্চারিত হতো তাদের রচিত কত পঙিক্ত।

 

আমাদের বরণীয় এই আটজন লেখকের মধ্যে দুজন লোকান্তরিত হয়েছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মারা গেছেন প্যারিসে, ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেছেন আমাদের এই চিরচেনা ঢাকা শহরে। তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। না, ভুল বললাম। নিঃস্ব কথাটা তার সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। তার মানসিক ঐশ্বর্যের কোনো কমতি ছিল না। তিনি রেখে গেছেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ যেগুলো পঠিত হবে দীর্ঘকাল। তার বহু পঙিক্ত বার বার গুঞ্জরিত হবে কাব্যপিপাসুদের স্মৃতিতে। যে কবিতা তিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেলেন তা তার স্মৃতিকে চিরদিন পাঠকদের মনে উজ্জ্বল করে রাখবে সত্য, কিন্তু কবিতা তাকে দেয়নি সচ্ছলতা, তার পরিবারকে দেয়নি কোনো নিরাপত্তা। সারা জীবন তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গেই ঘর করেছেন, জাহান্নামে বসেই হেসেছেন পুষ্পের হাসি। দারিদ্র্য তার শরীরকে ক্ষইয়ে দিয়েছিল ভীষণভাবে, কিন্তু কখনো কামড় বসাতে পারেনি তার মনের ওপর।

 

তার মতো অসামান্য কবি খুবই সামান্য একটা চাকরি করতেন। মাইনে পেতেন মাত্র ছ’-সাতশ’ টাকা অথচ তার ঘরে বারো-তেরোজন পুষ্যি। আজকের দিনে এই ক’টি টাকায় কী করে চালানো সম্ভব এত বড় সংসার? ফররুখ আহমদের কাব্যের সংসার যত জেল্লাদারই হোক না কেন, তার সংসার বরাবরই খুব নিষ্প্রভ। দারিদ্র্য ম্লান করে দিয়েছিল তার সংসারের মুখ। পয়সা কামানোর দিকে কখনো মন ছিল না তার। পারলে তিনি হয়তো চাকরিও করতেন না কখনো। ধরা-বাঁধা চাকরি করার মানসিকতা তার ছিল না। তিনি ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তাই, যখন তাকে রেডিও অফিসে দেখতাম একজন সামান্য চাকুরে হিসেবে, আমার কেমন যেন খটকা লাগত। সেখানে বড় বেমানান লাগত ফররুখ আহমদকে।

 

অনেক বছর আগেকার কথা। আমিও তখন রেডিওতে চাকরি করি। আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন দুটি বছর আমি কাটিয়েছিলাম রেডিওতে। কিন্তু আমার সেই কর্মজীবনের একমাত্র আনন্দ ছিল ফররুখ আহমদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া। মতাদর্শের দিক থেকে আমরা দুজন অবস্থান করতাম দুই বিপরীত মেরুতে। আমি জানতাম তার ঝাঁজালো রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা, তার অসিহষ্ণুতার কথা—কিন্তু এর কোনোটাই সে সময় আমার আর তার সম্পর্কের সঙ্গে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনিও ভালো করেই জানতেন আমার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের কথা, আমার রাজনৈতিক মতামতের কথা। তার সঙ্গে কখনো আমার কোনো রাজনৈতিক সংলাপ হয়নি। তিনি এড়িয়ে যেতেন, আমিও তাকে রাজনৈতিক তর্ক জুড়তে প্ররোচিত করিনি কোনো দিন। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেতে থাকতাম সাহিত্যালোচনায়। বিশেষ করে, কবিতার কথা বলতে ভালোবাসতেন তিনি। বিভিন্ন কবির পঙিক্তমালা তিনি আবৃত্তি করতেন, তার দীর্ঘ এলোমেলো চুল নেমে আসত কপালে, ধারালো উজ্জ্বল চোখ হয়ে উঠত উজ্জ্বলতর। তার আরেকটি প্রিয় প্রসঙ্গ ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা। মধুসূদনের কথা বলতে গেলেই তার কণ্ঠে বেজে উঠত অন্যরকম সুর। মধুসূদনের কবিতা অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারতেন তিনি। তার মৃত্যু-সংবাদ শুনে ছুটে গিয়েছিলাম কবির ফ্ল্যাটে। যে ফররুখ আহমদকে আমি বহুদিন বসে থাকতে দেখেছি আজিজিয়া রেস্টুরেন্টে, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে রেডিওর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়েছি, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে রমনার বৃক্ষ চূড়াময় পথে হেঁটেছি বহুদিন, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি দিনের পর দিন, যে ফররুখ আহমদকে কাজের ক্লান্তির মধ্যে কোনো দিন এতটুকু ঝিমুতে দেখিনি, সেই ফররুখ আহমদকেই দেখলাম তার নিভৃত শয্যায়। তাকে দেখলাম, নির্বাক, নিথর। কী আশ্চর্য, তিনি একবারও হাসিমুখে তাকালেন না আমার দিকে, বললেন না, কি চলবে নাকি এক পেয়ালা? না তিনি এই প্রথমবারের মতো আমাকে চা খেতে অনুরোধ করলেন না। অথচ তার কাছে চা না-খাওয়া ছিল অসম্ভব ব্যাপার। আমি অন্তত এমন একটি দিনের কথাও মনে করতে পারি না যে, আবুল মিয়ার দোকানে গিয়ে ফররুখ আহমদের পাশে বসেছি এবং চা ও নিমকি খাইনি। চা না খাইয়ে তিনি ছাড়তেন না। কোনো ওজর-আপত্তি তিনি শুনতেন না। ‘আরে খাও খাও, কিসসু হবে না, বলতেন সেই দরাজদিল মানুষটি।

 

অমন নিথর, নিঃশব্দ ফররুখ আহমদকে বড়ই বেমানান লাগছিল সেই বিছানায়। যেমন তাকে বেমানান মনে হতো রেডিওর কাজে। তার নিস্পন্দ শরীর আর তন্ময় নিদ্রার দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ল তারই লেখা কয়েকটি লাইন—

 

এ ঘুমে তোমার মাঝি-মাল্লার

ধৈর্য নাইকো আর

সাত সমুদ্র নীল আক্রোশে

তোলে বিষ কেন ভার,

এদিকে অচেনা যাত্রী চলেছে

আকাশের পথ ধ’রে

নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।

বেসাতী তোমার পূর্ণ করে কে

মারজানে মর্মরে?

ঘুমঘোরে তুমি শুনছো কেবল

দুঃস্বপ্নের গাথা

... তবু জাগলে না?

তবু তুমি জাগলে না?

 

তিনি আর কোনো দিনই জাগবেন না। তার প্রায় আসবাবহীন সেই ঘরে দেখলাম ইতস্তত ছড়ানো কিছু বই। দেখলাম, তার খুব কাছেই রয়েছে তার প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যগ্রন্থ। মধুসূদনের অকৃত্রিম শুভার্থী এবং উনিশ শতকী বাংলার অন্যতম প্রধান পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিও ফররুখ আহমদের অবিচল শ্রদ্ধা। তিনি প্রায়শ বলতেন, বুঝলে শামসুর রাহমান, এই বিদ্যাসাগরের মতো এক দেড়জন ব্যক্তি আমাদের সমাজে জন্মালে এই পচা-গলা সমাজের চেহারাটাই পাল্টে যেত।

 

কখনো-সখনো জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা উঠত, উঠত জীবন-সংগ্রামের কথা। এ প্রসঙ্গে একবার তিনি রানা প্রতাপ সিংহের পলাতক দিনের গল্প বলেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রানা প্রতাপ ঘুরছেন বনে-প্রান্তরে। শত দুঃখ-দুর্দশা সত্ত্বেও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি আকবর বাদশাহর কাছে। কিন্তু যেদিন একটা বুনো বেড়াল তার শিশুকন্যার হাত থেকে ঘাসের রুটি ছিনিয়ে নিয়ে গেল সে দিনই তিনি ধরা দিলেন আকবরের সৈন্যদের হাতে। তিনি একাধিকবার এই গল্প আমাকে শুনিয়েছেন। কেন এই গল্প বলতেন তিনি? হয়তো পুত্র-কন্যার মুখ চেয়ে চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেই এই গল্পটি তিনি বলতেন, যেমন নিজেকেই শোনাতেন সেই আত্মসমর্পণের অত্যন্ত মানবিক কাহিনী। হয়তো রানা প্রতাপ সিংহের সঙ্গে কোথাও নিজের একটা মিল খুঁজে পেতেন।

 

আমি আজ তার কাব্যের গুণাগুণ বিষয়ে কিছু বলব না। এ মুহূর্তে ব্যক্তি ফররুখ আহমদই আমার কাছে বড় হয়ে উঠছেন বার বার। মনে জেগে উঠছে নানা স্মৃতির ভগ্নাংশ। তবে এ কথা অবশ্যই বলব, তার মৃত্যুতে অনেকখানি গরিব হয়ে গেছে আমাদের কাব্যক্ষেত্র। একদা তিনি লিখেছিলেন—

 

গোধূলি তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল

অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা

শিঙে ভেসে এলো চাঁদ,

সাত সাগরের বুকে সেই শুধু

আলোক চঞ্চল,

অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোড়ে

রাত্রির নিষাদ

 

কিংবা

 

আমি দেখি পথের দুধারে

ক্ষুধিত শিশুর শব,

আমি দেখি পাশে পাশে উপচিয়া

পড়ে যায়

ধনিকের গর্বিত আসর।

আমি দেখি কৃষাণের দুয়ারে

দুর্ভিক্ষ বিভীষিকা,

আমি দেখি লাঞ্ছিতের ললাটে

জ্বলিছে শুধু অপমান টীকা,

গর্বিতের পরিহাসে মানুষ

হয়েছে দাস,

নারী হলো লুণ্ঠিতা গণিকার

 

মতো পঙিক্ত, তার লেখনী আর কোনো দিন চঞ্চল হবে না ভাবলেও দুঃখ হয়। আমার এই লেখা খুবই অকিঞ্চিত্কর তবে এইটুকু সান্ত্বনা অনেক বছর আগে দৈনিক মিল্লাতের রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে আমি এই প্রতিভাবান কবির প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছিলাম একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধে। একজন অর্বাচীন উত্তর সাধকের সেই প্রবন্ধ পাঠ করে তিনি অখুশি হননি, এই তথ্য আমার পক্ষে খুবই তৃপ্তিকর।

 

ফররুখ আহমদ কোনো ব্যাংক ব্যালান্স রেখে যাননি, রেখে যাননি কোনো জমিজমা। তার চিরনিদ্রার এতটুকু ঠাঁইয়ের জন্য জমি খুঁজতে গিয়েও বিড়ম্বিত হতে হয়েছে তার অনুরাগীদের। শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল উদ্ধার হয়ে এলেন কবি বেনজীর আহমদ। তিনি বললেন, আমি আমার ফররুখকে নিয়ে যাব আমার ডেরায়। একজন কবিকে কবরস্থ করা হলো আর এক কবির বসতবাড়ির সীমানায়। তার কবরের জমি নিয়ে যত ঝামেলাই হোক, তার সন্তানরা যত বঞ্চিতই হোক পার্থিব জমিজমা থেকে, তিনি রেখে গেছেন অন্যরকম বিঘা বিঘা জমি—যে জমির ফসল দেখে চোখ জুড়োবে সাহিত্য পথযাত্রীদের। এই সমৃদ্ধ জমি পেছনে রেখে তিনি নিজে যাত্রা করেছেন নতুন রহস্যময় পানিতে, নিরুদ্দেশ সফরে।

 

২৯ অক্টোবর ১৯৭৪ লেখা এই রচনাটি কবির ব্যক্তিগত দিনপঞ্জি থেকে মুদ্রিত।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল