ইসরা ও মিরাজ তাৎপর্য ও শিক্ষা
ইসরা ও মিরাজ একটি অলৌকিক, গৌরবময়, তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষাপূর্ণ ঘটনা। এটি শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের এক বিস্ময়কর অধ্যায় নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈমান, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা। শারীরিক ও আত্মিক-উভয় দিক থেকেই মিরাজ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য এক বিশেষ সম্মান এবং কষ্ট জর্জরিত সময়ে সান্ত্বনার অনন্য নিদর্শন। পবিত্র ইসরা ও মিরাজ এমন এক অলৌকিক ও আধ্যাত্মিক ঘটনা, যা কেবল সময়ের সীমা অতিক্রম করে না; মানব বুদ্ধি ও কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করে যায়। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে যেমন অনন্য, তেমনি সমগ্র মানবজাতির জন্যও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও নবুয়তের মর্যাদার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয় হিজরতের আগে, জীবনের অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত সময়ে। ভরসার দুই স্থান প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও স্নেহশীল চাচা আবু তালিবের কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকালের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন গভীর শোক ও কষ্টে জর্জরিত। এ দিকে তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি অপমানিত ও নির্যাতিত হন। এমন চরম বেদনাবিধুর মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে দিলেন এক অনন্য সম্মান তথা আসমানের সফর। যা ইতিহাসে ইসরা ও মিরাজ নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইসরা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতের কিছু অংশে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ১)
বস্তুত ইসরা হচ্ছে, মক্কা মুকাররমা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণের সেই পর্বটুকু, যা রাতের একটি অংশে সংঘটিত হয়েছিল। আর মিরাজ হচ্ছে, সেখান থেকে ঊর্ধ্বজগৎ পরিভ্রমণের বিস্তৃত অধ্যায়। আল্লাহ তাআলা সুরা নাজমে মিরাজ সম্পর্কে বলেন-বস্তুত সে তাকে (জিবরাঈল আ.-কে) আরও একবার দেখেছে। সিদরাতুল মুনতাহা (সীমান্তবর্তী কুলগাছ) এর কাছে। তারই কাছে অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া। তখন সেই কুল গাছটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেই জিনিস, যা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। রাসূলের চোখ বিভ্রান্ত হয়নি এবং সীমা লঙ্ঘনও করেনি। বাস্তবিকপক্ষে, সে তার প্রতিপালকের বড়-বড় নিদর্শনের মধ্য হতে বহু কিছু দেখেছে। (সুরা নাজম, আয়াত : ১৩-১৮)
কোরআন কারিমে ইসরা ও মিরাজের বিবরণ এসেছে সংক্ষেপে। বিস্তারিত বিবরণ এসেছে হাদিস শরিফে। হাদিসের ভাষায় মিরাজের ঘটনা নিম্নরূপ হিজরতের আগের কথা। রাসুলুল্লাহ (সা.) একরাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে ছিলেন। এরই মধ্যে আগমন করলেন জিবরাঈল (আ.)। তিনি নবীজিকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন জমজম কূপের কাছে। একটি স্বর্ণের পেয়ালা আনা হল। তা ছিল ঈমান ও হিকমতে পূর্ণ। তাতে জমজমের পানি। জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করলেন। বের করে আনলেন নবীজির হূদয়। জমজমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে আবার প্রতিস্থাপন করে দিলেন। ঈমান ও হিকমতে পূর্ণ করে দেওয়া হল নবীজির কলব। এরপর আনা হলো নবীজিকে বহন করার জন্য বুরাক নামক সওয়ারি। এটা এতটাই ক্ষিপ্রগতির যার একেকটি কদম পড়ে দৃষ্টির শেষ সীমায় গিয়ে। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুহূর্তেই পৌঁছে গেলেন বাইতুল মুকাদ্দাসে। বুরাক বেঁধে রাখা হলো পাথর ছিদ্র করে। যে পাথরে অপরাপর নবীরা নিজেদের বাহন বেঁধে রাখতেন। নবীজি সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। এ সফরে নবীজির সঙ্গে পূর্ববর্তী নবীদের সাক্ষাত্ হয়। তখন তিনি নামাজে সকলের ইমামতি করেন। নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় জিবরাঈল (আ.) নবীজির সামনে দুটি পেয়ালা পেশ করলেন। একটি দুধের অপরটি শরাবের। নবীজি দুধের পেয়ালা গ্রহণ করলেন। জিবরাঈল (আ.) বলেন, আপনি (দ্বিনের) স্বভাবসিদ্ধ বিষয়টি নির্বাচন করেছেন। নবীজির মদের পেয়ালা নেওয়ার পরিবর্তে দুধের পেয়ালা গ্রহণ করায় জিবরিল (আ.) বলেন, আপনি যদি মদের পেয়ালা নিতেন তাহলে আপনার উম্মত গোমরাহ হয়ে পড়ত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭২)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজ
এরপর শুরু হলো ঊর্ধ্বজগতের অভূতপূর্ব সফর। জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে নিয়ে চললেন। সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নবীজী প্রথম আসমানে গেলেন। সেখানে ছিলেন আদম (আ.)। জিবরাঈল (আ.) পরিচয় করিয়ে দিলেন। নবীজি আদম (আ.)-কে সালাম বললেন। আদম (আ.) জবাব দিলেন। নবীজি সাদর অভিবাদন জানালেন, মারহাবা, নেককার পুত্র ও নেককার নবী। আদম (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন। তার ডান পাশে কিছু রুহ আর বাম পাশে কিছু রূহ ছিল। তিনি ডানদিকে তাকালে হাসেন আর বাম দিকে তাকালে কাঁদেন। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি কে? জিবরাঈল (আ.) বলেন, ইনি আদম (আ.)। আর তার দুই পাশে তার সন্তানদের রুহ। ডানদিকেরগুলো জান্নাতি আর বামদিকেরগুলো জাহান্নামি। এজন্য তিনি ডানদিকে তাকিয়ে হাসেন আর বামদিকে তাকিয়ে কাঁদেন। এরপর নবীজি উঠতে থাকলেন দ্বিতীয় আসমানের দিকে। নবীজি সেখানে দেখতে পেলেন দুই খালাত ভাই ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)-কে। তারা নবীজিকে স্বাগত জানালেন—মারহাবা, আমাদের পুণ্যবান ভাই এবং সজ্জন নবী। তারা নবীজির জন্য দোয়া করলেন। এরপর নবীজির তৃতীয় আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে গিয়ে দেখলেন ইউসুফ (আ.)। ইউসুফের সাথে নবীজির সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। নবীজি (সা.) বলেন, ইউসুফকে যেন দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য ঢেলে দেওয়া হয়েছে! এরপর চললেন চতুর্থ আসমানের দিকে। সেখানে ইদরিস (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ হলো। সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। ইদরিস (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন। এরপর চললেন পঞ্চম আসমানের দিকে। সেখানে হারুন (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ হলো। এরপর চললেন ষষ্ঠ আসমানের দিকে। সেখানে দেখা হলো হযরত মূসা আ.এর সাথে। মুসা (আ.) নবীজিকে খুব ইস্তেকবাল করলেন। এরপর নবীজি সপ্তম আসমানের দিকে উঠতে থাকেন। সেখানে দেখা হল ইবরাহিম (আ.)-এর সাথে। জিবরাঈল (আ.) পরিচয় করিয়ে দিলেন—ইনি আপনার পিতা, সালাম করুন। নবীজি ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সালাম বিনিময় করলেন। নবীজি (সা.) বলেন, ইবরাহিম (আ.) তখন বাইতুল মামুরে হেলান দিয়ে ছিলেন। এরপর নবীজিকে নিয়ে যাওয়া হল সিদরাতুল মুনতাহার (সীমান্তবতীর্ কুলগাছ) দিকে। সেই কুল বৃক্ষের একেকটি পাতা হাতির কানের মতো। আর একেকটি ফল মটকার মতো বড় বড়। সৃষ্টির কারো সাধ্য নেই তার সৌন্দর্যের বিবরণ দেবার। জিবরাঈল বলেন, এটা সিদরাতুল মুনতাহা। এখানে চারটি নহর। দুটি অদৃশ্য আর দুটি দৃশ্যমান। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, দৃশ্যমান নদীদুটি কোনগুলো? জিবরাঈল বলেন, অদৃশ্যমান দুটি জান্নাতে। আর দৃশ্যমান দুটি হলো নীল নদ ও ফুরাত নদী। এরপর আল্লাহ তাআলা দিনরাতে উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিলেন। নবীজি (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাতের এ হাদিয়া নিয়ে ফেরত আসছিলেন; এর মধ্যে দেখা হয় মুসা (আ.)-এর সাথে। মুসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ আপনার উম্মতের জন্য কী দিয়েছেন? নবীজী বললেন, ৫০ ওয়াক্ত নামাজ। মুসা বললেন, আপনার উম্মত রাত-দিনে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারবে না। আপনার আগে আমি উম্মত চালিয়ে এসেছি। আপনি আল্লাহর কাছে গিয়ে কমিয়ে আনেন। নবীজি সে মতে আল্লাহর কাছে গিয়ে কম করে দেওয়ার দরখাস্ত করলেন। আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। নবীজী বলেন, এভাবে আমি আল্লাহ ও মূসার মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকি। শেষবার আল্লাহ বলেন, মুহাম্মদ! এই হলো দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। প্রত্যেক নামাজের বিনিময়ে ১০ নামাজের সাওয়াব। এভাবে বান্দা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব পাবে। নবীজি এ সওগাত নিয়ে ফেরত আসছিলেন। মুসা (আ.) এবার শুনে বললেন, আপনি যান, আরো কমিয়ে আনুন। আপনার উম্মত পারবে না। নবীজি বলেন, আমার আর কিছু বলতে লজ্জা হচ্ছে! (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৪২, ৩৮৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬২, ১৬৪, ১৭২)
এ সফরে নবীজিকে জান্নাত-জাহান্নামসহ অভূতপূর্ব ও অলৌকিক অনেক কিছু দেখানো হয়।
মিরাজ সফরের উপহার
এ সফরে নবীজিকে তিনটি উপহার দেওয়া হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং এই উম্মতের যারা শিরক থেকে বেঁচে থেকে মৃত্যুবরণ করবে তাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়ার ঘোষণা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬২, ১৬৪)
মিরাজের শিক্ষা
মিরাজের ঘটনা থেকে সরলদাগে যে শিক্ষাগুলো পাওয়া যায় সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ—
১. আল্লাহর সত্তা ও কুদরতের ওপর সঠিক বিশ্বাস রাখা। শিরক থেকে বিলকুল বেঁচে থাকা
২. আল্লাহর সাথে বান্দার দাসত্বের সম্পর্ক মজবুত করা।
৩. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া।
৪. সুর বাকারার শেষ আয়াতগুলোর শিক্ষা ও মর্মগুলো ধারণ করা।
৫. আল্লাহর হক ও বান্দার হকের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
৬. গিবত ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা। মানুষের সম্ভ্রমহানি না করা।
৭. শুধু লম্বা লম্বা বক্তৃতা নয়, খেয়াল করা—মানুষকে যে নসিহত করছি, আমার মধ্যে তা কতটুকু আছে।
৮. জান্নাতের ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া। জাহান্নামের ব্যাপারে ভীত থাকা।
৯. হাউজে কাউসারের প্রত্যাশী হওয়া।
১০. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।