শুক্রবার ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২ ১৪৩২, ২৭ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

নির্বাচনে জামায়াত ১৭৯ আসনে, এনসিপি ৩০ আসনে লড়বে ‘এবার গুলি ফস্কাবে না’, ট্রাম্পের রক্তাক্ত ছবি দেখিয়ে হুমকি ইরানের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ হচ্ছে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে এবার মামলা করছে দুদক হাদি হত্যা মামলার পুনঃতদন্তে সিআইডি অধ্যাদেশের দাবিতে সোমবার থেকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি, অনড় শিক্ষার্থীরা চলন্ত বাসে ছাত্রীকে রাতভর ‘দলবেঁধে ধর্ষণ’, চালক-হেলপারসহ আটক ৩ কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর আকাশসীমা আবার খুলেছে ইরান এসএসসি পরীক্ষা শুরু ২১ এপ্রিল ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, তেহরানের দাবি: ফাঁসির পরিকল্পনা নেই ট্রাম্পের ‘যুদ্ধক্ষমতা সীমিত’ লক্ষ্য থেকে সরে এল সিনেট ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি: অধ্যাদেশের দাবিতে ফের সড়কে সাত কলেজ পাবনা ১ ও ২ আসনে ভোটের বাধা কাটল হাসিনার আমৃত্যু কারাদণ্ডের মামলা আপিলের কার্য তালিকায় বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা বন্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারী এরফানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করল ইরান

ইসলাম

অনর্থক তর্ক এড়িয়ে চলাই ইসলামের রীতি

 প্রকাশিত: ১৫:২৮, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

অনর্থক তর্ক এড়িয়ে চলাই ইসলামের রীতি

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে মতভেদ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তার স্বভাবজাত বিষয়। কিন্তু এই মতভেদ যখন শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে অহেতুক তর্ক-বিতর্কে রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ইসলাম এ ধরনের অনর্থক তর্ককে কঠোরভাবে নিরম্নত্সাহিত করেছে। অযথা বিতর্ক অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি করে, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে এবং পূর্ববর্তী বহু জাতির ধ্বংসের কারণ হয়েছে। তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তর্কের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য অন্বেষণ ও সংশোধন, আত্মপ্রতিষ্ঠা বা জেদ প্রদর্শন নয়।

অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া নিন্দনীয় : অহেতুক ও অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া পুরোপুরি নিন্দনীয় কাজ। সমাজ ও ধর্ম—কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই কখনো অহেতুক তর্কে লিপ্ত হওয়া ঠিক নয়। এতে অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি হয়, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয় এবং একটি জাতি ধ্বংসের কারণ হয়। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে একটি আয়াত পড়তে শুনলাম। অথচ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে (আয়াতটি) অন্যরূপ পড়তে শুনেছি। আমি তার হাত ধরে তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, তোমরা উভয়েই ঠিখ পড়েছ। শুবা (রহ.) বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা বাদানুবাদ করো না। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাদানুবাদ করে ধ্বংস হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ২২৫০) 

আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত,নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের বিরোধিতা কোরো না; তাহলে তোমাদের অন্তরগুলো বিভক্ত হয়ে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮৫৮)

অসার তর্ক-বিতর্ক আল্লাহর অপছন্দনীয় : মুশরিকরা নবী (সা.)-এর পবিত্র জবানে ঈসা (আ.)-এর সুনাম শুনে অসার তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতো। তারা বলতো—যদি ঈসা (আ.) প্রশংসার যোগ্য হন অথচ খ্রিস্টানরা তাঁকে উপাস্য বানিয়েছে, তাহলে আমাদের উপাস্যগুলো নিন্দিত হয় কিভাবে? এরাও কি উত্তম নয়? কিংবা আমাদের উপাস্যগুলো যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে ঈসা (আ.)ও উযায়ের (আ.)ও জাহান্নামে যাবেন। তাদের এসব যুক্তিতর্ক ও শোরগোল করা বিতর্ক ছাড়া কিছুই নয়। তারা নিজেদের মত বহাল রাখার জন্য অযথা কথা কাটাকাটি করে। তাদের এসব দ্বন্দ্ব-কলহকে মহান আল্লাহ অপছন্দনীয়ভাবে প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং বলে, আমাদের দেবতাগুলি শ্রেষ্ঠ, না ঈসা? তারা কেবল বাকিবতণ্ডার উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে, বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সমপ্রদায়। ’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত : ৫৮) আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপছন্দনীয় হলো সেই ব্যক্তি, যে অতিমাত্রায় ঝগড়াটে ও বাকিবতণ্ডাকারী।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৬৭৩) 

বিতর্ক এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য জান্নাত : অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য নবী (সা.) জান্নাতের দায়িত্ব নিয়েছেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলবে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০০)

প্রয়োজনে সদ্ভাবে বিতর্ক করা : প্রতিপক্ষের কঠোর কথাবার্তার জবাব নম্র ভাষায়, ক্রোধের জবাব সহনশীলতার সঙ্গে এবং মূর্খতাসুলভ হট্টগোলের জবাব গাম্ভীর্যপূর্ণ কথাবার্তার মাধ্যমে দেওয়া যায়। প্রয়োজন হলে বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা করা যায়— উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণসহকারে, ভদ্র ও শালীন ভাষায় এবং বুঝবার ও বোঝাবার ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সদ্ভাবে; নিশ্চয়ই তোমার রব, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্পর্কে বেশি জানেন এবং কারা সত্পথে আছে তা-ও তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন। (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৫)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক করো না। ’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৬)

আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলে : আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটি উত্কৃষ্ট চরিত্র হলো— তারা জাহেল ও মুর্খ লোকদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে না। তারা এড়িয়ে চলার পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং ফালতু বিতণ্ডা বর্জন করে। তারা কোন অজ্ঞ শত্রুর কাছ থেকে নিজেদের সম্পর্কে অর্থহীন ও বাজে কথাবার্তা শুনলে তার জবাব দেয়ার পরিবর্তে একথা বলে দেয়, আমার সালাম গ্রহণ কর। আমি অজ্ঞদের সাথে বিতণ্ডায় জড়াতে চাই না। আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যখন অসার বাক্য শুনে তখন তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে, আমাদের আমল আমাদের জন্য এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্য; তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সাথে জড়াতে চাই না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৫৫) 

আল্লাহ আরো বলেন, ‘তারাই পরম দয়াময়ের বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’। (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩) এখানে ‘সালাম’ বলার অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও তর্ক-বিতর্ক ছেড়ে দেওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম অনর্থক ও অসার তর্ক-বিতর্ককে স্পষ্টভাবে নিন্দা করেছে এবং এটিকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অহেতুক ঝগড়া পরিহারকারী ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, যা এ আচরণের গুরুত্ব ও মর্যাদা নির্দেশ করে। তবে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইসলাম সদ্ভাবে, প্রজ্ঞা ও শালীনতার সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কখনো মূর্খতা ও হট্টগোলের জবাবে তর্কে জড়ায় না; বরং তারা ধৈর্য, নম্রতা ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দেয়। অতএব, ব্যক্তি ও সমাজের শান্তি, ঐক্য এবং নৈতিক উত্কর্ষ বজায় রাখতে অযথা তর্ক বর্জন করে হিকমতপূর্ণ সংলাপ ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করতে হবে।