রাষ্ট্র ও সমাজ রক্ষায় মহানবী (সা.)-এর বিশেষ পদক্ষেপ
ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর মহানবী (সা.)-এর নবুয়তের ১৬তম বছর। এখানে নবুয়তের ১৬ তম বছর বলতে তৃতীয় হিজরিকে বোঝানো হচ্ছে। নবুয়তপ্রাপ্তির পর মহানবী (সা.)-এর জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক. হিজরতের আগের ১৩ বছর। দুই. হিজরতের বছর থেকে নিয়ে বাকি জীবন।
হিজরতের তৃতীয় বছর তথা নবুয়তের ১৬তম বছর ছিল মুসলমানদের জন্য চ্যালেঞ্জের। এ বছর মুসলমানদের প্রথম ইসলামী ভূখণ্ড মদিনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত, সংকট মোকাবেলা ও সমাজ সংস্কারের জন্য বিশেষ কিছু সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নিম্নে নবুয়তের ১৬তম বছরে রাষ্ট্র ও সমাজ রক্ষায় নেওয়া মহানবী (সা.)-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তুলে ধরা হলো :
মুসলিম ভূখণ্ড রক্ষায় প্রতিরোধ কৌশল অবলম্বন : নবুয়তের ১৬ তম বছর তথা ৩য় হিজরিতে মুসলমানদের ভূখণ্ড পবিত্র মদিনাকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা, মুসলিম শক্তির প্রকাশ, সীমান্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে মহানবী (সা.) যে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তার একটি হলো, গাজওয়ায়ে যূ আমর, বদর ও উহুদ মধ্যবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বাধীনে এটাই সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এটা তৃতীয় হিজরীর মুহরম মাসে সংঘটিত হয় ।
কারণ মদিনার গোয়েন্দা বাহিনী রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খবর দেন যে বনু সালাবাহ ও মুহারিব গোত্রের এক বিরাট বাহিনী মদিনার ওপর আক্রমণ করার জন্য একত্রিত হচ্ছে। এ খবর শোনা মাত্রই রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন এবং আরোহী ও পদাতিক মিলে মোট চারশ জন সৈন্যেও বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। উসমান ইবনে আফফান -কে মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। মহানবী (সা.)-এর এ অভিযানটির উদ্দেশ্য ছিল, বেদুইনদের উপর প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলিমদের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের ওয়াকিবহাল করানোর জন্য তৃতীয় হিজরীর পূর্ণ সফর মাসটি তিনি সেখানে অতিবাহিত করেন। তারপর মদিনায় ফিরে আসেন। (সূত্র : আর-রাহিকুল মাখুতম [বাংলা], পৃ. ২৮৫)
একই বছর রবিউস সানি মাসে তিনি আবারও বুহরান নামক স্থানে তিন শ সাহাবি নিয়ে গমণ করেছিলেন। এটা হিজাজের মধ্যে ফুরয়া সীমান্তে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জায়গা। কথিত আছে, মদিনায় এ খবর পৌঁছে যে বনু সুলায়েম গোত্র মদিনা ও ওর আশেপাশে আক্রমণ চালাবার জন্যে খুব বড় রকমের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এটাও কথিত আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের কোনো এক যাত্রীদলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। (ইবনে হিশাম : ২/৫০-৫১, আর-রাহিকুল মাখুতম [বাংলা], পৃ. ২৮৮)
উভয় দিক বিবেচনায় বলা যায়, এটা ছিল মুসলমানদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৌশলগত নজরদারীর একটি অংশ। একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর কিছুদিন পর মহানবী (সা.) বদরের পরাজিত শক্তি কুরাইশদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করতে আরেকটি অভিযান করান। সেখানে কুরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে অবরোধ করা হয়। এতে মুসলমানরা কুরাইশদের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাত হানে। পরবর্তীতে মুসলমানদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যেখানে মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয় ঘটলেও তা সামরিক পরাজয় ছিল। বরং এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানদের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মুনাফিকগুলো চিহ্নিত হয়ে যায়। সে যুদ্ধে মহানবী (সা.) প্রিয় চাচা সাইয়্যেদুশ শুহাদা হামজা (রা.)সহ ৭০ জন সাহাবি শহীদ হন। কিন্তু সেই শোকে মুসলমানরা ভেঙে পড়েনি। বরং শোককে শক্তিকে পরিণত করে এর পর দিনই উহুদের সেই আহত সৈন্যদের নিয়েই হামরাউল আসাদ অভিযান করেন। কারণ কাফেররা উহুদের সাময়িক ভালো করলেও তারা মূলত তেমন কোনো ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল না, আবার মদিনাকে নিশ্চিহ্ন করার মতো এটাই ছিল তাদের মোক্ষম সময়, যা তারা নিজেরাও পথে গিয়ে চিন্তা করছিল এবং মদিনাতে তাণ্ডব করার উদ্দেশ্যে ফিরে আসার পায়তারা করছিল। কিন্তু যখন আবু সুফিয়ানের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট গেল যে মহানবী (সা.) সেনাদল নিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে, তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মক্কার দিকে দ্রুত পালিয়ে গেল। (আর-রাহিকুল মাখুতম [বাংলা], পৃ. ২৯১-৩২৮)
এভাবে মহানবী (সা.)-এর কৌশলগত পদক্ষেপের কারণে কাফেরা মদিনার ভেতরে প্রবেশ কিংবা জনগণের কোনো ক্ষতি করার সুযোগই পেল না।
অভ্যন্তরীণ শত্রু দমন ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা : মদিনার এক কুখ্যাত ইহুদির নাম ছিল, কাব ইবন আশরাফ। সে ছিল সে যুগের চৌকস জ্ঞানপাপী। আরবের পরিচিত কবি ছিল। সে তার কবিতার মাধ্যমে
মুসলমানদের বিপক্ষে উত্তেজিত কর। মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবিমূলক কাব্য রচনা করত। মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদিদের হওয়া চুক্তি ভঙ্গ করত, এ ছাড়াও রাষ্ট্রদ্রোহ, নারী সাহাবিদের সম্মান হানী করে এমন উক্তি করত, তাঁদের নিয়ে বাজে কবিতা লিখত। তার এসব রাষ্ট্রবিরোধী কর্ম কাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘কে এমন আছে যে কাব ইবনু আশরাফকে হত্যা করতে পারে? কেননা, সে আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.)-কে কষ্ট দিয়েছে এবং দিচ্ছে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইবনু মাসলামাহর নেতৃত্বে মুসলিমদের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়। (আর-রাহিকুল মাখুতম : পৃ. ২৮৫-২৮৮)
পর্দার বিধান অবতীর্ণ : সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতায় অত্যন্ত কার্যকরী একটি বিধান হলো, পর্দার বিধান। কারো কারো মতে এ বছরই মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে যয়নব বিনতে জাহাশের বিয়ে হয়। এবং তাঁর ওলিমার দিন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পর্দার বিধান নাজিল হয়। (বুখারি, হাদিস : ৪৭৯২)
মাদক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয় : সমাজ ধ্বংস করার অন্যতম উপাদান মদও চূড়ান্তভাবে হারাম করা এই বছর। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, তৃতীয় হিজরিতে উহুদ যুদ্ধের পর মদ চূড়ান্তভাবে হারাম করা হয়। (আল জামিউ লি-আহকামিল কুরআন)