ব্রেকিং:
বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত সাড়ে ১১ কোটি, মৃত্যু সাড়ে ২৫ লাখ

বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৯ ১৪২৭,   ১৮ রজব ১৪৪২

সর্বশেষ:
কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু নিয়ে যা বললেন গোলাম রাব্বানী আন্দামান সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠাতে চায় ভারত
৫৯৬

নববর্ষ : নতুন বছরের বার্তা

প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

জানুয়ারি ২০২১। দেখতে দেখতে একটি বছর শেষ হয়ে গেল। শুরু হল নতুন আরেকটি বছর। চলে যাওয়া বছরটি একাই যায়নি, সাথে করে নিয়ে গেছে অনেক মানুষকে, যারা আর কখনো এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে ফিরে আসবে না। ২০২১-এর প্রথম সূর্যোদয় যাদের উপর হয়েছে বছর শেষ হতে হতে তাদেরও অনেকের সময় ফুরিয়ে যাবে। ২২-এর সূর্যোদয় তাদের দেখার সুযোগ হবে না।

কী অমোঘ সত্য! এই সত্যকে হয়তো ভুলে থাকা যায়, কিন্তু অতিক্রম করা যায় না। কুরআন মাজীদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা-

كُلُّنَفْسٍذَآىِٕقَةُالْمَوْتِ،وَاِنَّمَاتُوَفَّوْنَاُجُوْرَكُمْیَوْمَالْقِیٰمَةِ،فَمَنْزُحْزِحَعَنِالنَّارِوَاُدْخِلَالْجَنَّةَفَقَدْفَازَ،وَمَاالْحَیٰوةُالدُّنْیَاۤاِلَّامَتَاعُالْغُرُوْرِ.

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখেল করা হবে সে-ই সফলকাম। এই পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৮৫

ক্ষণস্থায়ী জীবনের মানুষের সামনে কুরআনে কারীম এক জ্বলন্ত সত্য তুলে ধরেছে। আর তা তুলে ধরেছে পূর্ণাঙ্গভাবে। এখানেই কুরআনের বিশিষ্টতা। কুরআন মানুষকে পরিচিত করে পূর্ণ সত্যের সাথে।

আমরা বলি, মানুষ মরণশীল। একথা সত্য, তবে তা সত্যের অর্ধেক। মরণশীল মানুষের মৃত্যুর পর কী হবে তা এখানে নেই। কারণ তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। গায়েব। শুধু ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তো গায়েবের সংবাদ জানা যায় না। তা জানার উপায় কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন-সুন্নাহ্র সংবাদ ছাড়া মানুষ মরণশীল-এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়টুকুর তাৎপর্য স্পষ্ট হয় না। কাজেই ‘মানুষ মরণশীল’ কথাটা সত্যের অর্ধেক। এই অর্ধেকসহ পুরো কথাটা জানিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে। একারণে কুরআনের ইলম এত জীবন-ঘনিষ্ঠ।

কুরআন আমাদের জানাচ্ছে যে, মৃত্যুর পর মানুষকে তার কর্মফলের মুখোমুখি হতে হবে। হিসাব দিতে হবে জীবনের সময় ও কর্মের। সেই হিসাব-দিবসে যারা জাহান্নাম থেকে নাজাত পেয়ে জান্নাতে যাবে তারাই সফল।

এই অখণ্ডসত্য যদি চেতনায় স্পষ্ট হয়ে যায়, যদি মহান আল্লাহ্র অপার করুণায় মনের চোখ খুলে যায়, অপসারিত হয় অধর্মের, অবিশ্বাসের অপচ্ছায়া তাহলে মানবের সর্বসত্তা অকুণ্ঠচিত্তে বলে উঠবে-

وَمَاالْحَیٰوةُالدُّنْیَاۤاِلَّامَتَاعُالْغُرُوْرِ.

অর্থাৎ পার্থিব জীবন তো দুদিনের মায়া-মরীচিকামাত্র।

মৃত্যু ও পরকাল সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র বাণী কুরআনে কারীমে বারবার সচেতন করেছেন। একইসাথে মানুষের চারপাশের প্রকৃতিতে স্থাপন করেছেন চিন্তাশীলতা ও বার্তা গ্রহণের অসংখ্য উপাদান। দিন-রাতের গমনাগমন, সকাল-দুপুর-বিকেলের প্রাকৃতিক পরিবর্তন, সপ্তাহ-মাস-বছরের চক্রাকার আবর্তন-এই সবকিছু বারবার মানুষকে বলে যাচ্ছে তার বেলা ফুরোবার কথা। আপনার দেহ-মনের পরিবর্তন আপনাকে বার্তা দিচ্ছে। আপনার স্বজন-প্রিয়জনের চলে যাওয়া বার্তা দিয়ে যাচ্ছে-আপনারও বেলা ফুরোবার।

আপনি কি ভেবে দেখেছেন, মহান আল্লাহ কতবার আপনাকে বার্তা দিয়েছেন? কতভাবে দিয়েছেন? তবুও যদি ফিরে না আসেন তাহলে কীভাবে আশা করতে পারেন-চিরস্থায়ী জীবনে নাজাতের?!

মহান আল্লাহ বার্তা দিয়েছেন অসংখ্যবার, আপনি শোনেননি। যতদিন গেছে, না-শোনার পাল্লাই ভারী হয়েছে। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে এবার অন্তত শুনুন তাঁর ডাক। তিনি রহমান, তিনি রহীম; অতীতের জমে ওঠা সব অমনোযোগিতা, ভ্রæক্ষেপহীনতা তিনি এক নিমিষে ক্ষমা করে দেবেন। এমন যেন না হয় যে, তিনি শুধু ডেকেই গেলেন আর আপনি রইলেন মুখ ফিরিয়ে। আর এভাবেই আপনার আয়ু শেষ হয়ে গেল। তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলুন, কীভাবে, কোন্ যুক্তিতে মহান আল্লাহকে দোষ দিবেন?

আপনি সব বোঝেন। অর্থোপার্জনের লসাগু-গসাগু আপনার মুখস্থ। ক্ষমতা-প্রতিপত্তির সব রসায়ন কণ্ঠস্থ। রাজনীতির সরল-জটিল সকল সূত্র ঠোঁটস্থ। কূটনীতি-সমাজনীতির সূক্ষ্ম ও স্থূল সকল ইঙ্গিত আপনার কাছে আয়নার মতো পরিষ্কার। এই সবকিছু আপনি বোঝেন, শুধু বোঝেন না-আপনার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সমাপ্তির বার্তা! শুধু বোঝেন না-আপনার চারপাশের আবর্তনশীল দিন-রাতের ভাষাহীন বাণী! শুধু বোঝেন না-আপনার স্রষ্টা, আপনার রব আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আহ্বান ও হুঁশিয়ারি! বলুন, এই না-বোঝা কি আপনার পক্ষে যথেষ্ট অজুহাত?

যদি না হয় তাহলে এবার একটু থামুন। একান্তে নিজের সাথে বোঝাপড়া করুন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় নিজের দিকে একবার তাকান। গোধূলির লাল সূর্যের দিকে তাকিয়ে হিসাব করুন-তার অস্তাচলে যাওয়ার আর কতখানি বাকি!

মৃত্যুকে স্মরণ করুন। স্মরণ করুন মৃত্যুর পরের দিনগুলোকে। কী হতে পারে তখন? স্বজন-প্রিয়জনেরা আপনার মৃত্যুর সংবাদে চমকে উঠবে। বেদনায় ভারাক্রান্ত হবে। কিছুদিন অশ্রুফেলবে। এরপর সব আগের মতোই চলতে থাকবে।

পূর্বাকাশে সূর্য উঠবে। মানববসতি কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হবে। অফিস-আদালত-কলকারখানা চলতে থাকবে। পাখির গান, শিশুদের কোলাহল, স্বজন-প্রিয়জনের আবেগ-অনুরাগ কোনো কিছুতেই ছেদ পড়বে না। প্রত্যেকে তাদের পরিবার-পরিজন, স্বজন-প্রিয়জন নিয়ে উচ্ছল জীবন যাপন করবে, কিন্তু এই সবকিছু ঘটবে মাটির উপর। এই মাটিরই মাত্র তিন হাত নিচে সাড়ে তিন হাত একটি জায়গায় আপনি পড়ে থাকবেন একা! সম্পূর্ণ একা!! যেন এই কর্মচঞ্চল পৃথিবীর সাথে, এই সপ্রাণ মানুষগুলোর সাথে কোনো কালে আপনার কোনো পরিচয়ই ছিল না।

মাটির উপরের এই  মানুষগুলো আপনার মতোই একটা সময় পাড়ি দেবে। পৃথিবীর আলো-বাতাস গ্রহণের সুযোগ পাবে, কিন্তু আপনার কী হবে?

যে অর্থবিত্তের জন্য সকাল-সন্ধ্যা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন তা জনে জনে ভাগ করে নিয়েছে। যে ক্ষমতার জন্য নিজের ও অন্যের আরামের ঘুম হারাম করেছেন তা অন্যরা দখল করেছে। যে জ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে আপনার গর্ব ছিল, যে শিল্প-সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যুক্তির পর যুক্তি দিয়েছেন, বন্ধুদের সাথে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা হাতে উচ্ছ¡সিত সন্ধ্যা অতিবাহিত করেছেন, সভাসেমিনারে তত্ত¡ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন, আপনার জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতায় মুগ্ধ শ্রোতার করতালিতে সেমিনারকক্ষ ছটফট করে উঠেছে, এই সবকিছু সুখস্বপ্নের মতো কীভাবে মিলিয়ে গেল!

এখানে, এই কবরের জীবনে এসে দেখছেন-সবকিছু অচেনা, অজানা। আপনার এই বাস্তব ঘর-তিন হাত কবর, একেবারেই বিরাণ পড়ে আছে। এখানে লাগেনি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ছোঁয়া। এখানে না আছে বিদ্যুৎ,  না মোবাইল, না ইন্টারনেট। উপরে-নিচে চারপাশে শুধু মাটি, কাঁচা মাটি!

মাটির উপরে সারাটি জীবন কত কিছু করেছেন, কিন্তু মাটির নীচের আপনার নিজের এই ঘরটিকে প্রস্তুত করতে পারেননি। জীবনভর যা করেছেন সব মাটির উপরে রেখে এসেছেন। এখন এই মাটির ঘরে যা আপনার অতি প্রয়োজন তা সাথে আনতে ভুলে গেছেন।

বুকে হাত দিয়ে বলুন, তখন আপনার হাহাকার কোথায় গিয়ে পৌঁছবে? নিজেকে কেমন নিঃস্ব, অসহায় সর্বস্বান্ত মনে হবে? দুনিয়ার ফেলে আসা আলো-ঝলমলে জীবনটাকে কতইনা অসার প্রবঞ্চনাকর মনে হবে! আপনার চারপাশে যারা ছিল তাদেরকে মনে হবে শঠ, প্রতারক, প্রবঞ্চক। তখন তো আপনার বুক ফেটে মারা যাওয়ার মত অবস্থা হবে; কিন্তু না, মৃত্যু আর আসবে না!

আবারও স্মরণ করুন কুরআনের বাণী-

وَمَاالْحَیٰوةُالدُّنْیَاۤاِلَّامَتَاعُالْغُرُوْرِ.

হাঁ। এখনো সময় আছে। সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিন। সব মোহ-মায়া, অনুরাগ-বিরাগ, দর্প-অহংকার পুরোনো কাপড়ের মত ছুঁড়ে ফেলুন। পরম করুণাময় মহান আল্লাহ্র প্রতি সমর্পিত হোন। তাঁর সকল বাণীকে সত্য বলে মেনে  নিন। তাঁর সকল আদেশ শিরোধার্য করে তাকওয়ার নতুন লেবাসে নিজেকে সজ্জিত করুন।

তাকওয়ার লেবাসেই তো আপনাকে ভালো মানায়। আপনি না মুসলিম! আপনি না পড়েছেন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ! আবারো পাঠ করুন এই পবিত্র কালিমা। আখেরাতের জীবনে যা হবে আপনার সহায়, আপনার রক্ষাকবচ।

নতুন বছরে আপনার-আমার আমাদের সবার জীবনে উন্মোচিত হোক নতুন দিগন্ত। যে দিগন্ত সত্য ও ন্যায়ের, শুভ ও কল্যাণের, মুক্তি ও নাজাতের-আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন।


আল কাউসার
অনলাইন নিউজ পোর্টাল
অনলাইন নিউজ পোর্টাল
এই বিভাগের আরো খবর