মাঠে নামবেন মেসি, চোখ থাকবে ইতিহাসে
ইতিহাস লেখার কিছু বাকি আছে কী? নতুন করে কিছু প্রমাণের দরকারও কী আছে লিওনেল মেসির? নিশ্চিতভাবেই উত্তরটি ‘না।’ কিন্তু, তবুও কথা থেকে যায়। বিশ্বকাপের মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ে নামবে আর্জেন্টিনা, মেসি সে লড়াইয়ের সম্মুখসারির যোদ্ধা। যোদ্ধাদের যে চ্যালেঞ্জের শেষ নেই! মেসিও তাই নামবেন, নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে, আর্জেন্টিনার মুখে ফুটে থাকা হাসিটুকু ধরে রাখতে, টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস লেখার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
ক্যানসাস সিটিতে বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়া। মাঠে নামলেই টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার বনে যাবেন মেসি। অবশ্য, এদিন রাতে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের জার্সিতে আরেক মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো নামলে, রেকর্ডটি তখন হয়ে যাবে দুজনের।
গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে, দুজনে পায়ের জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন ফুটবল বিশ্বকে। দুজনেই শুনতে পাচ্ছেন, বিদায়ের রাগিনী। এই জুনের শেষের দিকে, ২৪ তারিখে ৩৯ বছর হবে মেসির। মাসের শুরুতে মিররের সাথে আলাপচারিতায় রেকর্ড ব্যালন দ’র জয়ী অনিশ্চয়তার সুরে বলেছিলেন, উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ তার পা পড়বে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে ঢের।
“আগের বিশ্বকাপের সময় যেটা বলেছিলাম, সে কারণে এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে আমার সংশয় ছিল। তখন ভেবেছিলাম, আরেকটি বিশ্বকাপ খেলা আমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কেননা, তত দিনে অনেকগুলো বছর কেটে যাবে।”
“কিন্তু আমি ভালো অনুভব করতে থাকলাম। এক-একটি দিন ধরে এগুতে থাকলাম। খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাতে ছন্দে থাকলাম, মাঠে থাকার সময় যত পেতে থাকলাম, ততই ভালো অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। এটা স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে। আমি খুশি, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি এবং এখন আমি আগের মতোই রোমাঞ্চিত।”
জাদুকরী বা পায়ে রোমাঞ্চের রেণু মেসি ছড়ান ২০২২ বিশ্বকাপেও। গোল করেন সাতটি। লুসাইলের ফাইনালে ফ্রান্সের জালে জোড়া গোলের পর টাইব্রেকারে প্রথম শটেও পান জালের দেখা। ১৯৮৬ সাল থেকে চলা খরা ঘুচিয়ে, ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে আর্জেন্টিনা।
মরুভূমির আসরে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের আলোকছটায় মেসি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো জিতেছিলেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি প্রথমবার। যদিও সেবার স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় তিনি পুড়েছিলেন, ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে।
কাতার বিশ্বকাপে আগে-পরে ক্লাব ক্যারিয়ারে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় মেসিকে। এই সময়ে প্রিয় বার্সেলোনাকে বিদায় বলে তিনি তুলে নেন পিএসজির জার্সি। সেটাও গায়ে জড়িয়ে রাখতে পারেননি বেশি দিন। ২০২৩ সালে যোগ দেন ইন্টার মায়ামিতে। যুক্তরাষ্ট্রের মেজর সকার লিগের দলটির হয়ে এরই মধ্যে জিতেছেন লিগ শিরোপা, ব্যক্তিগত স্বীকৃতি পেয়েছেন মেজর সকার লিগের এমভিপি (মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার) অ্যাওয়ার্ড জিতে।
এরই মধ্যে মেসির আকাশে হঠাৎ জমে উঠল কালো মেঘের ঘনঘটা। মায়ামির হয়ে বিশ্বকাপ বিরতির আগের ফাইনাল ম্যাচে তিনি মাঠ ছাড়লেন বাম পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের অস্বস্তি নিয়ে। হ্যাঁ, সেই বাম পা, যেটির দিকে আর্জেন্টিনা, ফুটবলপ্রেমীরা তাকিয়ে ছিল।
শঙ্কার মেঘটুকু কিছুটা সরতে থাকল, ধীরে ধীরেন সেরে উঠতে থাকলেন মেসি। স্বস্তির সুবাতাস বইতে থাকল আর্জেন্টিনার তাঁবুতে। সবশেষ আইসল্যান্ডের বিপক্ষের প্রীতি ম্যাচ বদলি নেমে তিনি জালের দেখা পেলে বাকি শঙ্কাটুকু উড়ে গেল কর্পুরের মতো। এখন মেসির সামনে অনেক কিছু পাওয়ার হাতছানি।
আলজেরিয়া ম্যাচ খেলতে নামলেই তো একটা রেকর্ডের চূড়ায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও শীর্ষে উঠবেন মেসি। এছাড়া আছে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের (১৬টি) রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার সুযোগ। জার্মান গ্রেট থেকে মাত্র ৩ গোল দূরে দাঁড়িয়ে তিনি। এরই মধ্যে রেকর্ডটি ভাঙার জন্য মেসিতে ‘স্বাগত’ জানিয়ে রেখেছেন ক্লোসা। সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক গোল করা ফুটবলারদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা গোলসংখ্যাও ১১৭ থেকে বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ কড়া নাড়ছে তার দুয়ারে।
কোচ লিওনেল স্কালোনি খুব সম্ভবত ২০২২ বিশ্বকাপের ছকই টেনে নিবেন এবারের আসরে। সেখানে থাকছে না কেবল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডের নির্ভরতা আনহেল দি মারিয়া। আক্রমণভাগ সাজাতে স্কালোনির হাতে বিকল্পের কমতি নেই। ধারণা করা হচ্ছে, লাউতারো মার্তিনসেকে আরও বড় ভূমিকায় খেলাতে পারেন কোচ। দুইবার ফিফা সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জেতা এমিলিয়ানো মার্তিনেসের সামনেও আছে দৃঢ়তাপূর্ণ রক্ষণভাগ।
যদিও এই ছক নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের শুরুতে হোঁচট খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলে বিস্ময়করভাবে হেরে বসেছিল সৌদি আরবের কাছে। সেই ম্যাচটিই অনুপ্রেরণা আলজেরিয়ার। আর্জেন্টিনাকে, মেসিকে হতবাক করে দিতে চায় তারাও।
এ নিয়ে বিশ্বকাপের আঙিনায় পঞ্চমবারের মতো পা পড়ছে আলজেরিয়ার। ২০১৪ আসরের পর এই প্রথম। সেবার প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠেছিল তারা। এবার ‘জে’ গ্রুপে আর্জেন্টিনার পর দ্বিতীয় দ্বিতীয় ফেভারিট দলের মধ্যে অস্ট্রিয়ার সাথে আছে আলজেরিয়াও।
মেসির দিকে যেমন আর্জেন্টিনা, তেমনি মোহামেদ আমৌরার দিকে আলজেরিয়া তাকিয়ে থাকবে গোলের দাবি নিয়ে। বাছাইয়ে আফ্রিকার দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গোল ছিল এই আমৌরার, ১০টি। মিশরের ফরোয়ার্ড মোহামেদ সালাহর চেয়ে একটি বেশি গোল করেন তিনি।
দলটির আক্রমণভাগে এছাড়াও আছেন, বেয়ার লেভারকুসেনে খেলা সম্ভাবনাময় তরুণ ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম মাজা। মেসির উদ্দেশে এই ২০ বছর বয়সী মাজা তো ছেড়েছেন হুঙ্কারও।
“বিশ্বকাপে ভালো সময় কাটাতে হবে আমাদের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। ওরা আমাদের অনেকভাবে প্রলুব্ধ, প্ররোচিত করতে চাইবে, কিন্তু আমাদের শান্ত থাকতে হবে, সর্বোচ্চটুকু দিতে হবে, বুদ্ধিদ্বীপ্ত ফুটবল খেলতে হবে। দেখা যাক, কী হয়। আমরা মেসিকে হারাবো, ইনশাল্লাহ।”
ইতিহাসে চোখ রাখা মেসি কী শুনছেন তরুণ মাজার হুঙ্কার?