৮ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট’ দিল জামায়াত
অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট পেশ করার আগেই ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি ‘ছায়া বাজেট’ দিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
দলটির ‘ছায়া বাজেটে’ জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, দুদক পুনর্গঠন, কর আদায়, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত ইসলামী তাদের ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করে।
এ সময় দলটির ‘বাজেট-দর্শন’ সম্পর্কে অবহিত করেন ‘ছায়া-বাজেট’ প্রণয়ন কমিটির প্রধান সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান মিলন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বাজেট দর্শন সংগঠনটির অর্থনৈতিক দর্শন থেকে উৎসারিত। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশকে সাম্য, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত একটি আধুনিক ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে অঙ্গীকারাদ্ধ।”
ছয় নীতিমালার ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামী তাদের ‘ছায়া বাজেট’ প্রণয়ন করেছে, বলেন সাইফুল আলম।
এই ছয়টি নীতিমালার মধ্যে রয়েছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের ব্যাপক সংস্কার, শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ, কর্মসংস্থানমুখী বাজেট ও বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ, করের অভিঘাত থেকে ক্ষু্দ্র ও মাঝারি শিল্পকে রক্ষা এবং আধুনিক কর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এর আগে শনিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির পক্ষ থেকেও ‘বাংলাদেশ ২.০ : সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ‘ছায়া বাজেট’ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণার আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা দেশকে ভালোবাসি বলেই জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের আলোকে কেমন বাজেট হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা জনগণের সামনে তুলে ধরছি। এটি কোনো চূড়ান্ত বাজেট নয়, বরং বাজেটের পূর্বধারণা বা প্রস্তাব।
“এখান থেকে যদি সরকার ভালো কিছু পিকআপ করে, জনগণ উপকৃত হবে। এটা কোনো দলের বিষয় নয়। আমরা এই বাজেট কোনো দলের জন্য দিচ্ছি না। এই বাজেট ১৮ বা ২০ কোটি মানুষের জন্য হতে পারে।”
এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা লাগবে মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, “সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যদি নিশ্চিত করা যায়, আমরা মনে করি যে বাজেট প্রস্তাব আমরা করব, সেটা অবশ্যই অর্জনযোগ্য। কিন্তু যদি সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকে তাহলে যে বাজেট সরকার দেয়, ওই বাজেট কার্যকর হবে না।”
তিনি মনে করেন, জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে পঞ্জিকা বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থবছর নির্ধারণ করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়া কমবে এবং বছরের শেষ দিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি ব্যয়ের নামে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগও হ্রাস পাবে।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ‘ছায়া বাজেটে’ ২৪.০৯ শতাংশ বরাদ্দ প্রস্তাব করেছে জনপ্রশাসন খাতে, টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ২ হাজার ২৪৫ কোটি।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (১৪.৯৬%) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা (৭.৭৮%) বরাদ্দের প্রস্তাব এসেছে জামায়াতে ইসলামীর ‘ছায়া বাজেটে’।
‘ছায়া বাজেট’ প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতারা।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি খাতে ৫১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা (৬.১৫%) এবং গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা (৫.৭৪%) বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে ৪৫ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) এবং তৃণমূলের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫ হাজার ২২০ কোটি টাকা (৫.৩৯%) বরাদ্দ রাখা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ‘ছায়া বাজেটে’।
প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা (৫.১৮%), অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা (৪.১০%) এবং দেশের শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ২৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা (২.৯৭%) বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছে জামায়াতে ইসলামী।
‘ছায়া বাজেটে’ মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ টাকা (অনুদানসহ)। অনুদান ছাড়া ঘাটতি বাজেট ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা।
‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির আহ্বায়ক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

