বৃহস্পতিবার ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৩ ১৪৩২, ১৭ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স পাচ্ছে ইরানের নারীরা যাদের শুরু ‘অনৈতিকতায়’, তারা সৎ শাসন দেবে কীভাবে: তারেক রহমান ফরিদপুরকে বিভাগ করার আশ্বাস দিলেন তারেক রহমান ভোটের পরিবেশ ‘তুলনামূলক ভালো আছে’: ইসি মাছউদ জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৭ মাসে সহিংসতায় নিহত ১৯৫ ইসলামী আন্দোলনের ৩০ দফা ইশতেহার, শরীয়াহকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি একটা গোষ্ঠী আমার পেছনে লেগেছে: জামায়াত আমির নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে: তারেক রহমান ‘রাজনীতি করেন, কিন্তু মিথ্যা বলবেন না’, জামায়াতের উদ্দেশে ফখরুল নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষ: গুলিতে কিশোরের মৃত্যু রাফা খোলার তিন দিন পর গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ২১ বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ২০০ বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত প্রার্থীর মৃত্যু, শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত জামায়াত আমিরের এক্স `হ্যাকড`: বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার আটক এনসিটি ইজারা ইস্যুতে বন্দরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, অচলাবস্থা তেল বিক্রির ৫০ কোটি ডলার ভেনেজুয়েলাকে ফিরিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্র

রাজনীতি

আওয়ামী লীগ নেই, জাপা দুর্বল, লালমনিরহাটে বিএনপি-জামায়াত ‘দ্বৈরথ’

 প্রকাশিত: ১০:৫২, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আওয়ামী লীগ নেই, জাপা দুর্বল, লালমনিরহাটে বিএনপি-জামায়াত ‘দ্বৈরথ’

সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট জেলায় অতীত নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় জামায়াতে ইসলামী ভোট কখনই উল্লেখযোগ্য ছিল না। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জেলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

ভোটারদের অভিমত, তিনটি আসনের মধ্যে দুটি আসনেই জামায়াত ইসলামী ও বিএনপির মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জামায়াত যদি এবার জেলায় কোনো আসনে জয়ী হয় তাহলে তাদের জন্য সেটি হবে ইতিহাস।

অপরদিকে নিকট অতীতে জেলায় বিএনপিরও জয়ের কোনো তথ্য নেই। ফলে এখানে বিএনপি যদি জিততে পারে তাহলে তাদের জন্যও সেটি হবে নতুন অভিজ্ঞতা।

জেলার একাধিক আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে জামায়াতে ইসলামীর জন্য ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ না হলে তাদের জন্য ‘বুমেরাং’ হতে পারে। অপরদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা, বিশেষ করে নারী কর্মীদের বাড়ি-বাড়ি প্রচার, দলটির অবস্থানকে কিছুটা শক্ত করেছে বলে মনে করেন ভোটাররা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রচারে সরগরম হয়ে উঠেছে এই জেলা। গ্রাম থেকে গ্রাম, হাট-বাজার থেকে চায়ের দোকান- সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে ভোট, প্রার্থী ও প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তুলে এবার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন ভোটাররা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচন তাদের কাছে শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে তিস্তা নদী ঘিরে উন্নয়ন বঞ্চনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও কৃষি সংকট- এসব ইস্যু ভোটের রাজনীতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

লালমনিরহাট-১: অভিজ্ঞতা বনাম সংগঠন

পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজুর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

পাশাপাশি জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার সক্রিয় উপস্থিতি এই আসনে নির্বাচনি উত্তাপ বাড়িয়েছে। হাতীবান্ধা এলাকায় রাঙ্গার বাড়ি হলেও তিনি দীর্ঘসময় রংপুরের গংগাচড়া উপজেলা থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার শুরু করেন। যদিও একসময় লালমনিরহাট জেলায় জাতীয় পার্টির শক্তিশালী অবস্থান ছিল। কালের পরিক্রমায় তা ম্রিয়মান হয়েছে।

জামায়াত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজু বলেন, “জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল দল। নির্বাচিত হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে উজাড় করে দেব।”

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান বলেন, “আগামী দিনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ শিল্প-কারখানা স্থাপন করে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়া হবে।”

আওয়ামী লীগের মোতাহার হোসেন এই আসনে দুই দশকের বেশি সময় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিএনপি বা জামায়াতের জয়ের ইতিহাস এখানে প্রায় নেই। আওয়ামী লীগের আগে এখানে জাতীয় পার্টি জয় পেয়েছে।

এবার এই আসনে যে পার্টিই বিজয় হোক, সেটি হবে তাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।

এই আসেন মোট ভোটার চার লাখ ৩৫ হাজার ৬১; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ২ হাজার ৭০৭ এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৮৫২। এখানে হিজড়া ভোটার রয়েছেন দুজন।

লালমনিরহাট-২: আওয়ামী লীগের ভোট টানতে মরিয়া দুদল

কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী রোকন উদ্দিন বাবুল। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ফিরোজ হায়দার লাভলু।

এ ছাড়া সদ্য নিবন্ধিত জনতার দলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামাল এই আসন থেকে লড়াই করছেন।

যদিও এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আলোচনা রয়েছে; তবে স্থানীয়দের ধারণা- মূল প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এই আসনটি থেকে বার বার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির জয়লাভ করেছেন। এখানে দুটি দলের ভাল ভোটও রয়েছে। ভোটারদের একটি অংশ মনে করেন, এই বিশাল ‘ভোট ব্যাংক’ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দুদলের নেতারাই কব্জায় আনার চেষ্টা করছেন। যার দিকে এই ভোট ঝুঁকবে তার দিকেই জয়ের পাল্লা ভারী হতে পারে।

আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের শঠিবাড়ি গ্রামের আমির আলী বলেন, “এই আসনে জামায়াত আর বিএনপির মধ্যেই লড়াই হবে। তবে জনতার দলও একেবারে পিছিয়ে নেই।”

বিএনপি প্রার্থী রোকন উদ্দিন বাবুল বলেন, “বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। কিছু ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও ভোটের দিন সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে।”

জামায়াত প্রার্থী ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, “ইনশাআল্লাহ, জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।”

এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৩২ হাজার ৯৬৪; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ১৭ হাজার ২০০ এবং নারী ভোটার দুই লাখ ১৫ হাজার ৭৬১। হিজড়া ভোটার রয়েছেন তিনজন।

লালমনিরহাট-৩: তিস্তা আন্দোলনের প্রভাব

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী আসাদুল হাবিব দুলু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়াই করছেন।

তার মুখোমুখি হবেন জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির আবু তাহের।

এক সময় জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির সাংগঠনিক প্রভাব বর্তমানে অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় ভোটারদের বড় একটি অংশ সাংগঠনিক দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্ততার কারণে আসাদুল হাবিব দুলুর প্রতি ঝুঁকছেন বলে জানা গেছে।

আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “এই এলাকার মানুষ আমার প্রাণ। তাদের সুখে-দুঃখে আমি সব সময় পাশে ছিলাম। ভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের রায় দেবে।”

এখানে জামায়াত ইসলামী বিভিন্ন সময়ে বিএনপিকে সমর্থন করলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত প্রচার ও গণসংযোগে ব্যাপক জোর দিয়েছে। ফলে ভোটারদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।

এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৭ হাজা্র ৯৭০। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৪ হাজার ১৬৭ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৫৩ হাজার ৮০১। এখানে হিজড়া ভোটার রয়েছে দুজন।

সীমান্ত জেলা, আলাদা বাস্তবতা

ভৌগোলিকভাবে লালমনিরহাট একটি দীর্ঘাকৃতির সীমান্ত জেলা। পাঁচটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই জেলার এক পাশে তিস্তা নদী, অন্য পাশে দীর্ঘ ভারতীয় সীমান্ত। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে তিস্তা নদী ও সীমান্ত বাস্তবতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। জেলার তিনটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯৬ জন।

সব মিলিয়ে লালমনিরহাটে এবারের নির্বাচন শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচনের লড়াই নয়; এটি তিস্তা সমস্যার সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানোর প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন জেলার মানুষ।

তিস্তা: প্রতিশ্রুতি ও বঞ্চনার গল্প

তিস্তা নদী লালমনিরহাটবাসীর কাছে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি বঞ্চনার প্রতীক। নদী শাসন, বাঁধ নির্মাণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার আশ্বাস বহুবার এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন ও বন্যায় নিঃস্ব হন হাজারো পরিবার। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ব্যাহত হয় চাষাবাদ।

একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকা হওয়ায় চোরাচালান, অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসব বিষয়ই এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে।

অনেক ভোটারই বলছেন, এবার আর শুধু দলীয় পরিচয় নয়- প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে ভোট দেওয়ার প্রধান মানদণ্ড।

নেতারা যা বলছেন

নির্বাচনের বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবীব দুলু বলেন, “গত তিনটি নির্বাচন থেকে ফ্যাসিস্ট সরকার বিএনপিকে দূরে রেখেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ফ্যাসিস্টকে হটিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ লালমনিরহাটকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।”

জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, “বিগত সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে লালমনিরহাটসহ সারাদেশে কোনোভাবেই কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। চব্বিশের জুলাইয়ের পর মানুষ জামায়াতে ইসলামীর পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

“১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তাদের শক্তি জানান দেবে বলে আমরা মনে করি।”

জেলা জাতীয় পার্টির সদস্যসচিব জাহিদ হাসান লিমন বলেন, “লালমনিরহাট জাতীয় পার্টির দুর্গ ছিল। কিছু সময় সেই দুর্গে কিছুটা ছেদ পড়েছিল। আমরা আশা করি, জেলাকে পুনরায় জাতীয় পার্টির দুর্গে পরিণত করতে পারব।”