সোমবার ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাঘ ২৭ ১৪৩২, ২১ শা'বান ১৪৪৭

ব্রেকিং

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে চাই: জাতির উদ্দেশে তারেক রহমান পরিবর্তনের ‘মহা সুযোগ’, আসুন কাজে লাগাই: ভোটের ভাষণে জামায়াত আমির ভোটকেন্দ্রে নেওয়া যাবে মোবাইল ফোন, নিষেধাজ্ঞা তুলছে ইসি পদত্যাগ করলেন বিচারপতি মামনুন রহমান ও নাইমা হায়দার সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকরা কেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন: ইসি নির্বাচনে কোনো হুমকি নেই: ডিএমপি কমিশনার হাদি হত্যা: প্রতিবেদন দাখিলে ফের সময় পেল সিআইডি র‌্যাব ও ডিজিএফআইয়ের বিলুপ্তি চাইলেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া সুদহার অপরিবর্তিত রেখে নতুন মুদ্রানীতি বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে ভোটের মাঠ লাইভ দেখবে ইসি ও সরকার নির্বাচন: দ্রুত বিচারে মাঠে নামছেন ৬৫৫ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়, ক্ষমতা সুসংহত হল জাপানের ‘লৌহমানবী’ তাকাইচির মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইয়ের ২০ বছরের কারাদণ্ড

রাজনীতি

পরিবর্তনের ‘মহা সুযোগ’, আসুন কাজে লাগাই: ভোটের ভাষণে জামায়াত আমির

 প্রকাশিত: ২০:৩৭, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পরিবর্তনের ‘মহা সুযোগ’, আসুন কাজে লাগাই: ভোটের ভাষণে জামায়াত আমির

নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী যেসব অঙ্গীকার করেছে, যেসব স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা ‘বিশ্বাস করে’ দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেওয়ার ‘আকুল আবেদন’ জানিয়েছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, “আল্লাহ পরিবর্তনের এক মহা সুযোগ আমাদেরকে এনে দিয়েছেন। আসুন সেটা কাজে লাগাই। বিগতদিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি। যেখানে সবাই মান ইজ্জত ও মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আই আহ্বান জানান জামায়াত আমির। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার এই ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচার করা হয়।

শফিকুর রহমান তার ভাষণে দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দেন, “আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহ ইচ্ছায় জনগণের ভালবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে প্রথম দিনে ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব।”

আর ভোটে জেতার জন্য তরুণ ভোটারদের পক্ষে টানতে তাদের ‘সমাজের ককপিটে’ বসিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জামায়াত আমির।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ নামের উড়োজাহাজটি তারাই চালাবে। তারাই হবে ক্যাপ্টেন। তারাই হবে এটার পাইলট। আমরা গিয়ে বসবো প্যাসেঞ্জার সিটে।

“হে তরুণরা, তোমরা তৈরি হয়ে যাও, এই দেশ তোমাদের জন্য, এই দেশ তোমাদের হাতেই তুলে দিতে চাই এবং এই দেশ তোমাদের হাতেই মানাবে। এই দেশ তোমাদের হাতেই গড়ে উঠবে, এটি আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

বক্তব্যের শুরুতে শফিকুর রহমান বলেন, “আজ আমি আপনাদের সামনে এখানে এসেছি কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক ভাষণ দিতে নয়। আজ আমি একেবারে মনের ভেতরের কিছু কথা বলতে চাই। যে কথাগুলো একজন জেন-জি, একজন যুবক, আর আমাদের প্রজন্ম সবার সাথে সম্পৃক্ত। একজন মুসলমানের জন্য যেমন, তেমনি আমাদের দেশের অন্য ধর্মের ভাই-বোনদের জন্যও।”

বক্তৃতায় তিনি জুলাই শহীদদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরও ‘গভীর শ্রদ্ধাভরে’ স্মরণ করেন।

দেশের মানুষ ‘পরিবর্তন চায়’ মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, “কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার থাকে না।

“এই হিম্মত দেখিয়েছে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদী ও তাদের সহযোদ্ধারা। তাদের রক্তের শপথ নিয়ে নতুন প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ সাহসী সন্তান আজ এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। এই দেশ আমাদের সময়ের এই সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুনরা রচনা করবে।”

তরুণদের উদ্দেশ্যে আমির বলেন, “আমরা তোমাদের হাত ধরতে চাই। জুলাইয়ের মত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে সঙ্গী হতে চাই। প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটা বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকুক, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক। এই আমাদের চাওয়া।”

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী সবাইকে নিয়ে ‘ঐক্যের’ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যে বাংলাদেশে “কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না।”

শফিকুর বলেন, “জনগণ চায় একটু নিরাপত্তা সুশাসন ও ইনসাফ । তাই আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই।”

আর চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর যে সংস্কার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তার ‘পূর্ণ বাস্তবায়নের’ জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আগামী নির্বাচন জাতিকে ‘একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার মহাসুযোগ’ হিসাবে এসেছে মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, “যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন।

“তাই জনগণকে ঠিক করতে হবে, আমরা আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের তরুণদের জন্য, আমাদের নারীদের জন্য, বয়স্ক মানুষের জন্য, প্রান্তিক জনপদের জন্য, শ্রমিকের জন্য, উদ্যোক্তাদের জন্য কোন বাংলাদেশ চাই।”

শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জামায়াতের ইশতেহার, নারী, ন্যায় বিচার নিয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি, যে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে হ্যাঁ এবং ৫টি বিষয়ে ‘না’ বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যাঁ বলতে বলেছি।

“কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজি-কে স্পষ্ট ‘না’ করতে হবে।”

তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। কর্পোরেট জগত থেকে রাজনীতি—সবখানে তাদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই।

“আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে, মেয়েকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।”

জামায়াত আমির বলেন, “সকল পরিচয় নির্বিশেষে আমরা অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে একটি মানবিক-উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সকলের মান-ইজ্জত-অধিকারের সুরক্ষা দিব ইনশাল্লাহ।

“এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মত ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।”

জনগণের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে তিনটি জায়গায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন জামায়াত আমির।

“একটি হচ্ছে শিক্ষায় সংস্কার। শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতা ভিত্তিক এবং সেটা হতে হবে টেক বেজড। এখনকার দুনিয়া সারাই প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার উপর নির্ভরশীল। আমরা সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমাদের সন্তানদের হাতকে আমরা দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এবং তাদের হাতে হাতে আমরা কাজ দিতে চাই। আমরা কোনো বেকারবাতা তাদেরকে তুলে দিতে চাই না।”

দ্বিতীয়ত বিচারাঙ্গনে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল আমরা আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে পারব। অন্যথায় দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কণ্ঠ রোধ করা মোটেই সম্ভব হবে না। অতএব বিচার বিভাগকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে অবশ্যই সৎ, দক্ষ এবং কমিটেড যে সমস্ত লোকেরা আছেন, তাদেরকে বিচারের আসনে বসাতে হবে।”

তৃতীয়ত অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলেন জামায়াত আমির।

“ এই ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে আগানো সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক যে সমস্ত খাত রয়েছে সেই জায়গাগুলোতে আমাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আমাদেরকে হাত দিতে হবে। আমাদের ব্যবসাকে করতে হবে বিনিয়োগবান্ধব।“

শফিকুর রহমান বলেন, “এই তিনটা জায়গায় আমাদের গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। আমরা আশা করব, দেশবাসী আমাদেরকে তাদের মূল্যবান ভোটের আমানত দিয়ে আমাদের দেশকে প্রত্যাশার আলোকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন।”

আলেমদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা অঙ্গীকার করছি ভবিষ্যতে কেউ আপনাদেরকে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচার বহির্ভূতভাবে আপনাদেরকে হত্যা করতে পারবে না।

“আমরা জানি অতীতে আপনাদের কোনো মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোড়দার করা হবে।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতা বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সম মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করব। আমরা অন্যের ভৌগলিক অখণ্ডতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব, তেমনি সকল দেশের সাথে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেব।”

শফিকুর রহমান বলেন, তারা বিশ্বাস করেন যে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে ‘আমানত’।

“রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব–আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “আমরা হযরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখব যে, ‘ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকব’। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকব।”

বক্তব্যের শেষ দিকে জামায়াতের আমির আবারও ভোট চেয়ে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সবাই যদি দাঁড়িপাল্লা এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে, তাহলে তারা ‘প্রত্যাশার একটি দেশ’ খুঁজে পাবে।

“আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ পরিবর্তন চায়, সেই পরিবর্তন জন্যই আমাদের এই আহ্বান, এই পরিবর্তন আমাদের হাতেই ইনশআল্লাহ মানাবে, অন্য কারো হাতে নয়।”