বুধবার ২৫ মার্চ ২০২৬, চৈত্র ১১ ১৪৩২, ০৬ শাওয়াল ১৪৪৭

ব্রেকিং

নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জেনারেল মাসুদকে এবার দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জোর দেওয়ার তাগিদ জোবাইদা রহমানের প্রাথমিকের ‘আটকে যাওয়া’ বৃত্তি পরীক্ষা শুরু ১৫ এপ্রিল যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ভ্যান্স-রুবিও, ‘শুনতে আগ্রহী’ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আরও ‘তিন-চার হাজার সেনা পাঠাতে যাচ্ছে’ যুক্তরাষ্ট্র কক্সবাজারে ছুরিকাঘাতে ‘জুলাই যোদ্ধা’ নিহত স্বাধীনতা দিবস ঘিরে স্মারক ডাক টিকেট উন্মোচন প্রধানমন্ত্রীর ইতিহাসের নৃশংস গণহত্যার রাত: প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চ কালরাত স্মরণে ‘ব্ল্যাক আউট’ কর্মসূচি ‘হবে না’ সোনা-রুপার দামে বড় পতন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ শর্ত

ইসলাম

বদনজরের কুফল ও তার প্রতিকার

 প্রকাশিত: ১৫:৫৯, ২৫ মার্চ ২০২৬

বদনজরের কুফল ও তার প্রতিকার

কারো প্রতি হিংসা পোষণ করা এবং হিংসা প্রসূত বদনজর দুনিয়া ও আখেরাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কুদৃষ্টি তার একান্ত জীবনের শান্তি যেমন নষ্ট করে। সাথে সাথে কুদৃষ্টিতে পতিত ব্যক্তির জীবনের সজীবতা, স্বাভাবিক প্রবাহ ভয়াবহ বাঁধাগ্রস্ত করে। 

হিংসা সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলা হিংসার মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করতে শিখিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, (আপনি বলুন, এবং আমি তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করছি) হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে (সুরা ফালাক: ৫)।  

অভিশপ্ত ইয়াহুদী সম্প্রদায় ঈমানের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়ার বড় একটি কারণ হলো এই হিংসা। কোরআন এ দিকে ইঙ্গিত করে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দান করেছেন সে বিষয়ে তারা তাদেরকে হিংসা করে (সুরা নিসা: ৫৪)।

হিংসা প্রসূত বদনজর ভয়ানক ধারালো। কোরআনে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। কাফেরদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, কাফেররা যখন কোরআন শোনে তখন (তাদের চাহনি এমন হয়) যেন তারা তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়িয়ে দেবে এবং তারা বলে, এ তো এক পাগল! (সুরা কলাম: ৫১)  

কোরআনের মতো হাদিসে পাকেও এ ব্যাপারে সতর্কতা এসেছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 

ইরশাদ করেন, মানুষের হৃদয়ে দুটি জিনিস কখনো একত্রিত হতে পারে না, আর তা হলো ঈমান ও হিংসা। (নাসাঈ:৩১১১/ ৩১১৩) 

হিংসা পবিত্র জীবনেকে খুব সহজেই নিঃষেশ করে দেয়। ঠিক আগুন যেভাবে শুকনো লাকড়িকে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। হাদিসের বাণীও তাই, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাক, কেননা হিংসা ভালো কাজ কে নিঃশেষে করে দেয়, যেভাবে আগুন শুকনো লাকড়িকে ভষ্মিভূত করে। (আবু দাউদ: ৪৯০৩)

সাথে সাথে বদনজরের মন্দ প্রভাব সম্পর্কেও সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে হাদিসের মাঝে। সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বদনজরের কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বাস্তব। কোন জিনিস যদি তকদির কে অতিক্রম করার ক্ষমতা রাখতো, তাহলে সেটা হতো বদনজর। অতএব তোমাদের (বদনজর সম্পন্ন লোকদের) গোসল করাতে বলা হলে তোমরা গোসল করাবে। (সহিহ মুসলিম: ২১৮৮) 

অন্য হাদিসে এসেছে, হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, বদনজর মানুষ কে কবরে, আর উটকে রান্নার হাঁড়িতে প্রবেশ করায়। (আবু নুআঈম, আলবানী: ৪৪১৪) 

মুসনাদে তয়ালিসীতে বদনজরের ভয়াবহতা সংক্রান্ত একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মত তকদিরের ফায়সালার পর সবচে বেশি ধ্বংস হবে বদনজরের প্রভাবে। (আলবানী: ১২০৬) 

‌সুতরাং মুমিন হিসেবে আমাদের উচিত সর্বাবস্থায় এ বিপদ থেকে বেঁচে থাকা। এর জন্য আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ, কাউকে হিংসা করা বা বদনজর দেওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা দয়া করে তাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, এর প্রতি অসন্তোস প্রকাশ করা। আর এটাই কুফরী। সুরা কাহফের ৩৯ নং আয়াতের মর্মার্থও তাই। উলামায়ে কেরাম এমন ব্যাখ্যাই করেছেন। আমরা যদি একটু চিন্তা করি। তাহলে অনুভব করতে পারব যে, আসমান- জমিনে সংগঠিত প্রথম নাফরমানিও ছিল এই হিংসাহেতু। তাই এক বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, তোমরা পরস্পরে হিংসা করো না। ( সহিহ মুসলিম: ২৫৫৯)

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের মধ্যে কোন মনোমুগ্ধকর কিছু দেখবে। তখন যেন সে তার জন্য বরকতের দুয়া করে। ( ইবনে মাজা: ৩৫০৯) এটা খুবই ফলপ্রসূ একটি বিষয়। অর্থাৎ কারো মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে তার জন্য 'মাশাআল্লাহ্' ' বারাকাল্লাহ্' ইত্যাদি বাক্যে দোয়া করা। এতে যেমন ঐ ব্যক্তি হিংসাত্মক দৃষ্টির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। সাথে সাথে এই দুয়ার মর্ম ভাব হৃদয়ে ধারণ করার ফলে নিজেও ঈর্ষা থেকে বেঁচে থাকা যায়।

‌অপর পক্ষে হিংসাত্মক আচরণ ও বদনজরের কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে আমরা কিছু কাজ করতে পারি। প্রথম কথা হলো আমার সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, সচ্ছলতা দেখে যেন কারো হিংসা উদ্রেক না হয়। এর জন্য শুরু থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা। এটাই নববী শিক্ষা। যেমনটি হযরত ইয়াকুব আ. তার সন্তানদের শিখিয়েছেন। সুরা ইউসুফের সেই প্রসিদ্ধ আয়াত থেকে এমনই বুঝে আসে। আয়াত নাম্বার -৬৭। 

তবে কথা হলো এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত কৃপণতা করা হয়। এটা আবার কাম্য নয়। কেননা হাদিসে পাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন. নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপর তার নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ দেখতে চান। ( তিরমিযী: ২৮১৯) সুতরাং উভয় দিক সামনে রেখে ভারসাম্য পূর্ণ জীবন মানের মার্জিত রূপটিই গ্রহণ করা উচিত। এটাই সর্বোত্তম মধ্যম পন্থা।

দ্বিতীয়ত, সব সময় কুরআন- সুন্নাহয় বর্ণিত আত্মরক্ষামূলক কিছু দুয়া পরা। যেমন, আয়াতুল কুরসি। ( সকাল- সন্ধ্যা) - সুরা ফালাক, সুরা নাস।( সকাল- সন্ধ্যা)- আঊযূ বিকালিমাা তিল্লাা হিততাা ম্মাাতি মিন শাররি মা খালাক। ( সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার) - বিসমিল্লা- হিল লাযী লা- ইয়াদুররু মা'আ ইসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়া লা- ফিস সামাই, ওয়া হুয়াস সামীউল আলীম। (সকাল- সন্ধ্যা ৩ বার) - আ‘ঊযু বিকালিমাা তিল্লাা হিত তা ম্মাতি মিন কুল্লি শাইত্বাা নিউ ওয়া হাা ম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনীন লাাম্মাহ। - কারো থেকে কোন প্রকার ক্ষতির আশঙ্কা হলে পড়বে আল্লাাহুম্মা ইন্নাা নাজ‘আলুকা ফী নুহূ রিহিম ওয়া না‘ঊযুবিকা মিন শুরূ রিহিম। এবং এধরনের অন্যান্য দোয়া।

‌এরপর কথা হলো বদনজর (চোখ লাগা)র কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। জীবনের সজীবতা নষ্ট হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নানা রূপে প্রকাশ পায়। যেমন: ইবাদতে অনিহা, চর্মরোগসহ গায়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা অনুভব হওয়া, মেজাজ খিটখিটে, অলসতা, কাজকর্মে অনীহা, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের ঝামেলার সম্মুখীন হওয়া সহ কারণ ছাড়া এধরনের আরো অনেক কিছুই ঘটতে পারে।

হাদীস শরীফে এ ধরনের একটি বর্ণনা আছে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে বের হন। তার সাথে ছিল হযরত সাহল ইবনে হুনাইফ রা.। তিনি ছিলেন খুবই ফর্সা ত্বকের অধিকারী। তো তারা যখন জুহফা নামক স্থানে পৌঁছেন। তখন হযরত সাহল রা. গোসল করছিলেন। তার পাশ দিয়ে হযরত আমের ইবনে রবিয়া অতিক্রম করার সময় তাঁকে দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করে। সে বলে আমি আজকের মতো কাউকে দেখিনি। এমনকি কোন কুমারী মেয়ের ত্বক ও এত ফর্সা হয় না। এই মন্তব্য করার সাথে সাথে হযরত সাহল রা. তৎক্ষণাৎ সেখানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। তাঁকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত করা হলে। তিনি পূর্বাপর সব কথা শুনে বলেন, তোমাদের কেউ কেন তার ভাইকে বদনজরের মাধ্যমে হত্যা করতে চায়! যখন তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মধ্যে মনোমুগ্ধকর কিছু দেখবে তখন যেন সে তার জন্য বরকতের দুয়া করে।

এরপর তিনি হযরত সাহল ইবনে হুনাইফের রা. চিকিৎসা বলে দেন। আর তা হলো নজরকারি আমের রা. তার অজুর অঙ্গগুলো ধুয়ে একটি পাত্রে সেই পানি জমা করবে। এবং তা হযরত সাহলের গায়ে ঢেলে দেওয়া হবে। যথারীতি এ চিকিৎসায় তিনি এমন ভাবে সুস্থ হয়ে যান, যেন তার কিছুই হয়নি। ( ইবনে মাজা- ৩৫০৯)

 এ ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি বিষয় বুঝতে পারি। ১, বদনজরের তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়াও খুব প্রকট ভাবে প্রকাশ পেতে পারে। ২, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদনজরের ক্ষতি কে 'হত্যা' শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। এতে অনুমিত হয় এটা গর্হিত কাজ। ৩, কারো কোন সচ্ছলতা দেখে হিংসাত্মক মনোভাব থেকে বের হওয়ার পন্থা। ৪, বদনজরের প্রভাবমুক্ত হওয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি। আর তা হলো সম্ভাব্য নজরদারি ব্যক্তির অজুর অঙ্গ সমূহ একটি পাত্রে ধৌত করে সে পানিটি নজর আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে ঢেলে দেওয়া।

এর থেকে উত্তরণের পথ হলো। ক. যেমন এ হাদীস থেকে জানতে পারি। অর্থাৎ বদনজরদারি ব্যক্তির অজুর অঙ্গ সমুহ একটি পাত্রে ধুয়ে সে পানি টুকু নজর আক্রান্ত ব্যক্তির গায়ে ঢেলে দেওয়া। খ. সুন্নাহ সমর্থিত রুকয়া, তথা ঝার-ফুঁক করা। যেমন হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষাক্ত প্রাণীর দংশন, বদনজর ও ব্রণ- ফুসকুরি সারাতে ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন। ( ইবনে মাজা-৩৫১৬) 

অন্য বর্ণনায় আছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালমা রা. এর গৃহে একজন কিশোরীর মুখে দাগ দেখে বললেন, তাকে ঝাড়ফুঁক করো। কেননা তার গায়ে বদনজরের প্রভাব আছে। (মুসলিম -৫৬১৮) 

‌এপর্যায়ে কুরআন - সুন্নাহয় বর্ণিত কিছু দুয়া উল্লেখ করা হলো:- ক. সুরা ফাতিহা। খ. আয়াতুল কুরসি। গ. আয়াতে শিফা। ঘ. সুরা ফালাক ও সুরা নাস। ঙ. বিসমিল্লাহি ইয়ুবরী-কা ওয়ামিন কুল্লি দা-ইন ইয়াশফী-কা ওয়ামিন শাররি হা-সিদিন ইযা হাসাদ ওয়ামিন শাররি কুল্লি যী আয়নিন। চ. বিসমিল্লাহি আরক্বি-কা মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ুযী-কা মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন আল্লাহু ইয়াশফী-কা বিসমিল্লাহি আরকী-কা। এবং উপরে উল্লেখিত দুয়া সমূহ।