নতুন হামলা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আশাবাদী ট্রাম্প
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, নতুন করে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চললেও তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।
একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র আরও সেনা মোতায়েন করছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সর্বশেষ সহিংসতার মধ্যে ইরান দাবি করেছে, যুদ্ধ চলাকালে দ্বিতীয়বারের মতো বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এটি একটি বেসামরিক স্থাপনা, যা উপসাগরীয় জনবহুল এলাকার কাছে অবস্থিত। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে কখনো ইরানের ওপর বড় হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আবার কখনো যুদ্ধ প্রায় শেষ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সঙ্গে ‘আলোচনার মধ্যে রয়েছে’—যদিও ইরান আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে তিনি তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়ার কথা ভাববেন। পরে তিনি আলোচনার অগ্রগতি উল্লেখ করে সময়সীমা বাড়ান।
এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, এ আলোচনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি.ভ্যান্সসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা যুক্ত রয়েছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, যিনি শুক্রবার এই সংকট নিয়ে জি-৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজন করবেন, ইরানকে ‘সদিচ্ছার সঙ্গে’ আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে সহিংসতা থেমে নেই। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এলিট ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন থেকে প্রায় ৩,০০০ সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধ শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন—যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। এফপির ছবিতে তেল আবিবের বাণিজ্যিক এলাকায় ধ্বংসস্তূপ দেখা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার ইসরাইলে এক ডজনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।
ইসরাইল জানায়, তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে ‘বড় ধরনের বিমান হামলা’ চালিয়েছে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র বলেন, তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তারা ‘হুমকি দূর করতে ও ক্ষতি বাড়াতে’ অভিযান চালিয়ে যাবে।
চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতরা এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছেন, যার সময় ১৫ দফা চুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা হবে। এতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয় থাকতে পারে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে।
ইরান ২০১৫ সালে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, যা ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে প্রত্যাহার করেন এবং ইসরাইলের সঙ্গে মিলে চাপ প্রয়োগ শুরু করেন।
প্রস্তাবিত সমঝোতায় ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো বিষয় নেই। যদিও কয়েক সপ্তাহ আগে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেন, ইরানে কার্যত ইতোমধ্যেই ‘শাসন পরিবর্তন’ ঘটেছে।
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং ট্রাম্পকে ‘আর্থিক ও তেল বাজারে প্রভাব ফেলার’ চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে’ বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অনুরোধের ইঙ্গিত রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরাইলেই সীমিত নয়। ইসরাইল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে এবং দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
ইসরাইলি হামলায় লেবাননে অন্তত ১,০৭২ জন নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় আরও অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি তিন বছর বয়সী শিশুও রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জানায়, হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ ইসরাইলে রকেট হামলা শুরু করে, যা এই সংঘাতে দেশটিকে জড়িয়ে ফেলে।
বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। তেহরানের এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, ‘বিস্ফোরণ, ক্ষেপণাস্ত্র—এসব এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।’
তেলবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। আলোচনার খবরের পর দাম কিছুটা কমলেও পরে আবার বেড়ে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।