রোজা কী ও কেন
রোজার আরবি শব্দ হলো সিয়াম বা সওম। অর্থ: উপবাস করা বা বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় রোজা বলা হয়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোজা ভঙ্গের অন্যান্য কাজ থেকে বিরত থাকা। রোজা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তার বান্দাদের ওপর একটি পবিত্র বিধান। রোজার মাধ্যমে মুমিনের আত্মিক পবিত্রতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক উন্নতি ও সামাজিক সাম্যের নিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়।
রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করা ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। মনের খাহেশাত ও কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সুরা বাকারা: ১৮৩)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, রমজান মাস হলো এমন মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে কোরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়াত ও সঠিক পথ অন্বেষণকারীদের জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই তাতে রোজা রাখে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে সে অন্যান্য দিনে এর সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য ( তার বিধানকে ) সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না। (এবং এই বিধান এই জন্য ) যাতে তোমরা ( রোজার ) সংখ্যা পূরণ করতে পারো এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহ তায়ালার বড়ত্ব ঘোষণা করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সুরা বাকারা: ১৮৫)
রোজার বিধান আল্লাহ তায়ালা শুধু শেষ নবীর উম্মতদেরকেই দেননি, বরং পূর্বের নবী-রাসুলদের উম্মতের প্রতিও ছিল রোজার পালনের বিধান। কোরআনে রোজার বিধান সম্বলিত আয়াতে একথা সুস্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পারো। ( সুরা বাকারা: ১৮৩)
তবে পূর্ববর্তী উম্মতের রোজা পালনে কিছু ভিন্নতা ছিল। যেমন: যখন হযরত ঈসা আ. এর জন্ম হয়, তখন লোকজন তাঁর মা মরিয়মকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, আমি করুণাময় মালিকের উদ্দেশ্যে রোজা পালনের মানত করেছি। তাই আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না। (সুরা মারয়াম: ২৬) তাঁর সেই রোজাটা ছিল কথা বলা থেকে বিরত থাকার রোজা।
হযরত নুহ আ. এর যুগেও রোজা পালিত হতো। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নুহ আ. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ছাড়া পুরো বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, হযরত নুহ আ. এর যুগ থেকে প্রতি মাসে তিনটি রোজা আবশ্যক ছিল। (ইবনে কাসির)
জাহিলি যুগে মানুষেরা আশুরার রোজা পালন করত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, অন্ধকার যুগে মানুষরা আশুরার রোজা পালন করত। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও আশুরার রোজা পালন করেছেন। এরপর রমজানের রোজা ফরজ হলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে চায় আশুরা দিনে রোজা রাখবে আর যে না চায় সে ওই দিনের রোজা পরিহার করবে। (সহিহ বুখারি)
মানুষ রমজান মাস ছাড়া অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন রোজা রাখলেও কেবল রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। রমজান মাসে রোজা রাখার ফজিলতও অনেক বেশি। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন, বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও খাহেশাত বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজেই এর পুরস্কার দিব। আর (অন্যান্য) নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ। (সহিহ বুখারি: ১৮৯৪)
রোজা সম্পর্কে অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারীর জন্য, পক্ষান্তরে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (সহিহ বুখারি: ১৯০৪)
রমজান মাস ছাড়া বছরের অন্যান্য দিনে রোজা রাখার ফজিলতও হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে বিজের ( প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের ) রোজা রাখতেন। (নাসায়ি)