সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দোষারোপের রাজনীতিতে মানুষের পেট ভরে না: তারেক রহমান নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ হচ্ছে শাকসু নির্বাচন ৪ সপ্তাহের জন্য স্থগিত ইসি যোগ্যতার সঙ্গেই নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম: ফখরুল রুমিন ফারহানাকে শোকজ, সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দাবি না মানলে নির্বাচন ভবনের ফটক অবরোধের হুঁশিয়ারি ছাত্রদলের অর্থ আত্মসাৎ: এস আলম, পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিচার শুরু আলিফ হত্যা: চিন্ময়সহ সব আসামির বিচার শুরুর আদেশ কুর্দিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল-শারা ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রে মিছিল সংসদ-গণভোট: ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শুরু ২২ জানুয়ারি স্পেনে দুই হাইস্পিড ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ২১

ইসলাম

মাদরাসায় ‘আকাবির সপ্তাহ’ চালু করুন!

 প্রকাশিত: ১৬:০৬, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

মাদরাসায় ‘আকাবির সপ্তাহ’ চালু করুন!

হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন বিগত শতাব্দীর জগদ্বিখ্যাত হাদিস বিশারদ হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর সুযোগ্য পুত্র। নিকট অতীতের আকাবির সম্বন্ধে তাঁর জানাশোনার পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। নিজ শাগরেদদেরকে জোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলতেন, আমাদের মনীষীদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়মিত পাঠ করো। তাঁদের জীবনী পাঠ করলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবে, সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে এবং চিত্তাকর্ষক নিত্যনতুন ভ্রান্ত মতবাদের প্রভাব থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার শিক্ষা অর্জন করবে।

হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ আরও বলতেন, দেখো, কেবল বই-পুস্তক পড়ে কিছু তথ্যগত জ্ঞান অর্জন করা গেলেও সেই জ্ঞানের (ইলমের) আলোকে জীবন সাজানোর ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী পুণ্যবান মনীষীগণ (সালাফে সালিহীন) এর জীবনেতিহাস পাঠের কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই ‘কিতাবুল্লাহ’ এবং ‘রিজালুল্লাহ’— উভয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, আজকাল ছাত্রদেরকে আকাবির উলামায়ে কেরামের জীবনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে দেখা যায়, এ বিষয়ে তাদের কিছুই জানা নেই; সম্পূর্ণ বেখবর!

হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর সুযোগ্য পুত্র, শায়খুল হাদীস মাওলানা সায়্যিদ আহমদ খিজির শাহ মাসউদী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ বলেন, এই করুণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আব্বাজান মাওলানা আনযার শাহ সাহেব মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত জরুরি একটি পরামর্শ দিতেন। তা হলো, প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সকল তালিবুলইলমকে সমবেত করে আমাদের বড়দের জীবনী শোনানো। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে যেন ছাত্ররা আকাবিরের জীবনালেখ্য পাঠ করে, সে জন্য তাদের উৎসাহ প্রদান ও তদারকিও উসতাযগণের দায়িত্ব। বরং পরীক্ষায় ছাত্রদেরকে এ-বিষয়ক প্রশ্নপত্র রাখলে আরও ফলপ্রসূ হবে।

আকাবিরের জীবনী জানার গুরুত্ব বোঝাতে হজরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ প্রতিবছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ‘আকাবির সপ্তাহ’ এর আয়োজন করতেন। ইলম অর্জনে আকাবিরের ত্যাগ, ইলম অনুযায়ী আমলে তাঁদের মুজাহাদা, বিনয় ও নম্রতা, তাকওয়া ও পবিত্রতা, নিষ্ঠা ও ধৈর্য, দ্বীনের ওপর ইস্তেকামত ও অবিচলতা এবং ইলমের প্রচার ও সংরক্ষণে তাঁদের নজিরবিহীন কুরবানির কথা তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে আলোচনা করতেন।

মাদরাসার তালিবুলইলমদের বর্তমান যে দূরাবস্থা, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের মাদরাসাগুলোতেও মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর ‘আকাবির সপ্তাহ’ আয়োজন করা অপরিহার্য হয়ে গেছে। অন্তত প্রতি মাসে একটি বিশেষ মজলিসের আয়োজন করা দরকার, যেখানে কোনো একজন আকাবিরের জীবনী ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

কয়েক দিন আগে দারুল উলূম করাচীর দস্তারবন্দী উপলক্ষে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী সাহেব হাফিযাহুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজকাল আমাদের মাদরাসার তালিবুলইলমরা যাঁদের উসিলায় দ্বীন ও ইলম অর্জনের সুযোগ পেয়েছে, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— সেই আকাবিরে দেওবন্দ সম্পর্কে কিছুই জানে না। আকাবিরের জীবন ও অবদান জানার কোনো আগ্রহও তাদের মধ্যে নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে উসতাযগণের মাঝেও আকাবিরের জীবনচর্চার কোনো দায়িত্ববোধ পরিলক্ষিত হয় না।

মাওলানা মুহাম্মাদ কাসিম নানুতবী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা আশরাফ আলী থানবী— এই মনীষীদের জীবনী আজ ক’জন পাঠ করে? হযরত বলেন, ‘তাযকিরাতুর রশীদ’, ‘মালফুযাতে হাকীমুল উম্মত’, ‘আপবীতী’ প্রভৃতি গ্রন্থ আমাদের সকলেরই পাঠ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, আমি যদি জীবিত থাকি, তবে আগামী রমজানের পর থেকে শুরু হওয়া মাদরাসার নতুন শিক্ষাবর্ষে দারুল উলূম করাচীতে তা’লীমের পাশাপাশি ‘তাযকিয়াহ’ (আত্মশুদ্ধি) এর বিশেষ কার্যক্রম চালু করবো ইনশাআল্লাহ। আর আমি যদি মারা যাই, তবে ওসিয়ত করে যাচ্ছি— রমজানের পর থেকে এই তাযকিয়ার বিশেষ মেহনত যেন এখানে অব্যাহত থাকে। কেবল বই পড়ে ইলম অর্জন করলে তা বাস্তবিক ইলম হয় না; এই ইলম ব্যক্তি ও উম্মাহর জন্য কল্যাণকরও হয় না। আমলের জযবা সৃষ্টি করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নিকট অতীতের আকাবিরের জীবনীপাঠ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে যারা আলেম হচ্ছেন তাদের উদ্দেশে হযরত বলেন, কোনো একজন আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের সঙ্গে অবশ্যই ইসলাহী সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। ইলমের মাঝে তখনই নূর আসবে, আপনার ইলম তখনই আলো ছড়াতে পারবে যখন আপনি কোনো বুজুর্গের সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক গড়বেন এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হবেন। আমাদের আকাবির সবসময় তাঁদের মুরব্বিদের পরামর্শ নিয়ে চলতেন। সেজন্য তাদের ইলম ও আমলে ভরপুর বারাকাত ছিলো। তাঁদের মাধ্যমে দ্বীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম পেয়েছে। সেজন্য আকাবিরের 'মালফুযাত' ও 'মাওয়াইয' পড়বার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

হযরত মাওলানা আনযার শাহ কাশ্মীরি ও হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী— এই দুই মনীষীর উপর্যুক্ত উপদেশ আমাদের সকলের জন্যই আমলযোগ্য হয়ে উঠেছে। হাদীস পড়ছে, অথচ সারা বছর হযরত আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রাহিমাহুল্লাহ এর মতো নিকট অতীতের এই জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস সম্পর্কে কিছুই জানে না— এটা কতটা দুঃখজনক!

কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা। কানাইঘাটের বুজুর্গ আলেম ও প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেব রাহিমাহুল্লাহ এর খেদমতে হাজির হয়েছিলাম; তাঁর ছেলে হযরত মাওলানা আতাউল করীম মাকসুদ সাহেবের সঙ্গে। দিনটি ছিল রমজানের। আমি তখন সবেমাত্র কাফিয়া পড়েছি। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আরেকজন মেধাবী তরুণ আলেম, যিনি রমজানের আগেই সিলেটের একটি স্বনামধন্য মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেছেন।