সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

ইরানে স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত ইন্টারনেট সেবা চালুর পর ফের বন্ধ

 আপডেট: ১২:২৭, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

ইরানে স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত ইন্টারনেট সেবা চালুর পর ফের বন্ধ

বিক্ষোভ দমনের আড়ালে হাজারো মানুষ হত্যার ঘটনা গোপন করতেই ইরানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে অভিযোগ করেছে, সেই ব্ল্যাকআউট শুরুর ১০ দিন পর রোববার স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত আকারে ইন্টারনেট সেবা ফের চালু হলেও তা আবার বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা।

প্যারি থেকে এএফপি এখবর জানায়।

এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতার ওপর কোনো হামলা হলে সেটিকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে দেখা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করার পর এই সতর্কবার্তা আসে।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই এমন এক আন্দোলনে রূপ নেয়, যাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জানুয়ারির ৮ তারিখ থেকে শুরু হওয়া যোগাযোগ ব্ল্যাকআউটের আড়ালে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এই বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে আসে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস রোববার রাতে জানায়, ‘ইরানে নির্দিষ্ট কিছু গুগল ও মেসেজিং সেবায় অতি সীমিত ও কঠোরভাবে ফিল্টার করা পুনরুদ্ধারের পর আবারও ট্রাফিকের মাত্রা কমে গেছে।’

ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, শুরুতে বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল, পরে তা ‘দাঙ্গায়’ রূপ নেয় এবং এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মতো শত্রু রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব রয়েছে।

জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেওয়ার পর ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ওয়াশিংটন আপাতত কিছুটা পিছু হটলেও, শনিবার ‘পলিটিকো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে আক্রমণ করে বলেন, ‘ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’

ট্রাম্প বলেন, ‘লোকটি একজন অসুস্থ মানুষ। তার উচিত দেশ সঠিকভাবে চালানো এবং মানুষ হত্যা বন্ধ করা।’

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের দেশের মহান নেতার ওপর হামলা মানে ইরানি জাতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ।’

ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, রাস্তায় এখন শান্তি ফিরেছে।

এএফপি সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সাঁজোয়া যান ও মোটরসাইকেলে টহল দিতে দেখা গেছে নিরাপত্তা বাহিনীকে।

এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর রোববার স্কুলগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেজেশকিয়ান জানান, তিনি ‘সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবকে যত দ্রুত সম্ভব ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।’

কিছু ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করা যাচ্ছিল। মঙ্গলবার থেকে আন্তর্জাতিক কল চালু হয় এবং শনিবার এসএমএস সেবা ফের চালু করা হয়।

রোববার ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, সরকারের ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর ইরানসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বার্লিন, লন্ডন ও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংহতি বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নানা তথ্য বাইরে পৌঁছেছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভয়াবহ নির্যাতনের খবর পেয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা সাম্প্রতিক দিনে যাচাই করা বহু ভিডিও ও বিবরণে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ‘বিক্ষোভকারীদের গণহত্যার’ প্রমাণ পেয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এসব তথ্য তারা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্বাধীন সূত্র থেকে যাচাই করেছে।

তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। সংবাদমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি এবং ইরানি কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট কোনো মৃত্যুর সংখ্যা জানায়নি।

অন্যান্য হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে—তবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে স্বাধীন যাচাই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে আইএইচআর জানিয়েছে।

বিদেশভিত্তিক বিরোধী চ্যানেল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ দাবি করেছে, জ্যেষ্ঠ সরকারি ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, বিক্ষোভে অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

ইরানের বিচার বিভাগ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

শনিবার খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘এজেন্টদের’ হাতে ‘কয়েক হাজার’ মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

খামেনি বলেন, কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ‘বিদ্রোহীদের কোমর ভেঙে দিতে হবে’। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা ২০ হাজার পর্যন্ত মানুষ আটক হয়ে থাকতে পারে।

রোববার বিচার বিভাগের মুখপাত্র আসগর জাহাঙ্গির জানান, দ্রুত বিচার কার্যক্রম চালানো হবে এবং কিছু অপরাধে ‘মোহারেবাহ’ বা ‘আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার’ মতো মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অভিযোগ আনা হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সহিংসতার আহ্বানে যারা নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছে, যার ফলে রক্তপাত ও সরকারি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

গ্রেপ্তার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, এমনকি ট্রাম্প দাবি করেছেন—ইরান শত শত ফাঁসি কার্যকর করা থেকে সরে এসেছে।

বিশ্লেষক আরিফ কেস্কিন ট্রাম্পের এই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরানি নেতৃত্ব বিক্ষোভ দমন, ভবিষ্যৎ আন্দোলন ঠেকানো এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মৃত্যুদণ্ডকে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখে।’