সোমবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, মাঘ ৬ ১৪৩২, ৩০ রজব ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

কুর্দিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল-শারা

 আপডেট: ১২:২২, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

কুর্দিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল-শারা

সিরিয়ার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরকারি বাহিনী অগ্রসর হওয়ার পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণা করেছেন।

দামেস্ক থেকে এএফপি জানায়, সিরীয় কুর্দি নেতা মাজলুম আবদি বলেন, বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে তিনি এ চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন।

রোববার সিরিয়ার রাক্কা শহরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও দামেস্কপন্থী স্থানীয় যোদ্ধাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পাশাপাশি চলতি মাসে কুর্দিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ের পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।

চুক্তির আওতায় কয়েক মাস ধরে অচলাবস্থায় থাকা আলোচনার পর কুর্দি প্রশাসন ও বাহিনী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত হবে।

তবে এ চুক্তি সংখ্যালঘু কুর্দিদের জন্য একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তারা এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে যে বাস্তবিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছিল, তা সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের।

রোববার সাংবাদিকদের কাছে এ চুক্তির ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট শারা।

তিনি বলেন, কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর প্রধান মাজলুম আবদির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল, কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা সোমবার পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।

‘পরিস্থিতি শান্ত করতে আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,’ বলেন শারা।

কুর্দি টেলিভিশন চ্যানেল রোনাহিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আবদি বলেন, ‘এই যুদ্ধ যেন গৃহযুদ্ধে পরিণত না হয়,  সে জন্য আমরা দেইর ইজ্জর ও রাক্কা অঞ্চল থেকে সরে গিয়ে হাসাকেহে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।’

তিনি জানান, দামেস্ক থেকে ফেরার পর সিরিয়ার কুর্দিদের কাছে চুক্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন।

গত সপ্তাহান্তে সরকারি বাহিনী রাক্কা অঞ্চলের কৌশলগত শহর তাবকা এবং ইউফ্রেতিস বাঁধ দখল করে। তারা দেইর ইজ্জর প্রদেশের বিভিন্ন অংশে, যেখানে দেশের সবচেয়ে বড় আল-ওমর তেলক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে অগ্রসর হয়। এর আগে তারা আলেপ্পো প্রদেশেও অগ্রগতি অর্জন করে।

চুক্তি ঘোষণার পর কিছু এলাকায় উদযাপনের খবর দেয় সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এর মধ্যে রাক্কা শহরও রয়েছে, যেখানে এর আগে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল এসডিএফের গুলিতে দুই বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, শহরটিতে এসডিএফ ও ‘স্থানীয় আরব গোত্রভিত্তিক যোদ্ধাদের’ মধ্যে লড়াই হয়েছে।

রোববার শারা যুক্তরাষ্ট্রের দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ব্যারাক কুর্দিদের সঙ্গে চুক্তিটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদল’ বলে আখ্যা দেন।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি বাহিনীকে সমর্থন করে এলেও সিরিয়ার নতুন ইসলামপন্থী কর্তৃপক্ষকেও সমর্থন দিচ্ছে। ব্যারাক শনিবার ইরবিল শহরে আবদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

সিরীয় প্রেসিডেন্সি ১৪ দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করেছে। এতে এসডিএফ ও কুর্দি নিরাপত্তা বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একীভূত করা এবং কুর্দি নিয়ন্ত্রিত দেইর ইজোর ও রাক্কা প্রদেশ অবিলম্বে হস্তান্তরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর বন্দি ও তাদের পরিবারের দায়িত্ব কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত কারাগার ও শিবির থেকে দামেস্কের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

‘দিস উইক ইন নর্দার্ন সিরিয়া’ নিউজলেটারের গবেষক ও লেখক আলেকজান্ডার ম্যাককিভার বলেন, এ চুক্তি ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এসডিএফ যে অবস্থান বছরের পর বছর ধরে গড়ে তুলেছিল এবং যে বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার জন্য তারা আলোচনা চালাচ্ছিল—তার তুলনায় অনেক কম।’

শুক্রবার শারা কুর্দিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে একটি ডিক্রি জারি করলেও কুর্দিরা বলেছে, সেটি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

রোববার সকালে রাক্কার উপকণ্ঠে থাকা এএফপির এক প্রতিবেদক গুলির শব্দ শোনার কথা জানান এবং বলেন, সরকারি বাহিনী অতিরিক্ত সেনা এনে শহরের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছে।

সিরিয়ান অবজারভেটরির প্রধান রামি আবদেল রহমান এএফপিকে বলেন, এসডিএফ হঠাৎ করে পূর্ব দেইর ইজোর গ্রামীণ এলাকার সব নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল, যার মধ্যে আল-ওমর ও তানাক তেলক্ষেত্র রয়েছে, সেখান থেকে সরে গেছে।

তিনি বলেন, দেইর ইজ্জর ও রাক্কা প্রদেশে এই অগ্রগতি ঘটেছে যখন স্থানীয় গোত্রের যোদ্ধারা, যাদের মধ্যে এসডিএফভুক্ত আরব যোদ্ধারাও রয়েছে, সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অগ্রসর হয়েছে।

দেইর ইজ্জর প্রাদেশিক প্রশাসন রোববার সব সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে এবং জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানায়।

সরকারি অভিযানে সেইসব আরব-অধ্যুষিত এলাকা পুনর্দখল করা হয়, যেগুলো আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।

দামেস্ক আরও জানায়, তারা রাক্কা প্রদেশের সাফিয়ান ও আল-সারওয়া তেলক্ষেত্র পুনরুদ্ধার করেছে।

জ্বালানি মন্ত্রী মোহাম্মদ আল-বাশির বলেন, এসব সম্পদ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসা মানে ‘পুনর্গঠন, কৃষি, জ্বালানি ও বাণিজ্য পুনরুজ্জীবনের দরজা পুরোপুরি খুলে যাওয়া।’

সেনাবাহিনী তাবকার কাছে ইউফ্রেতিস বাঁধের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও জানায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি ও জ্বালানি অবকাঠামো, যেখানে সিরিয়ার অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে।

এএফপির এক প্রতিবেদক তাবকার আশপাশে সাঁজোয়া যান ও ট্যাংক দেখতে পান এবং রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর টহল লক্ষ্য করেন।

দোকানপাট বন্ধ ছিল, তবে কিছু বাসিন্দাকে ঘরের বাইরে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ হুসেইন এএফপিকে বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। সিরীয় সেনাবাহিনী আসার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে- এটাই আশা করি।’

এএফপির এক আলোকচিত্রী বাঁধের কাছে দেখেন, বাসিন্দারা কুর্দি বাহিনীর হয়ে লড়াই করা এবং রাক্কা যুদ্ধের সময় আইএসের হাতে নিহত এক নারীর স্মরণে নির্মিত একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলছেন।