আজ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী
আজ বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী।
১৯৩৬ সালের এই দিনে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছিল।
সারাদেশের মানুষ আজ বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে এই দেশপ্রেমী রাষ্ট্রনায়ককে।
দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে দুইদিনের কর্মসূচি। সকালে দলের মহাসচিবসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরাসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন। আগামীকাল তার স্মরণে আলোচনা সভায় অংশ নেবেন বিএনপির জাতীয় নেতারাসহ দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক জীবন ছিল বীরত্বগাথায় ঠাসা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় এবং জাতীয় নেতৃত্ব যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তার সেই সাহসী উচ্চারণ- “উই রিভোল্ট।" মুহূর্তের মধ্যে ওই ঘোষণা পুরো জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছিল।
স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরই ছিল মুক্তিকামী বাঙালির প্রধান অনুপ্রেরণা। যুদ্ধক্ষেত্রে ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন।
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান। সে সময় দেশ ছিল একদলীয় শাসন ও চরম অরাজকতার কবলে। জিয়াউর রহমান এসে ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তিনি একদলীয় বাকশালের অবসান ঘটিয়ে দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক উদার ও জাতীয়তাবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ডান-বাম-মধ্যপন্থী সব দেশপ্রেমিক শক্তি একত্রিত হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। তার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দর্শন বাঙালি জাতিকে এক স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দিয়েছিল।
জিয়াউর রহমান কেবল একজন সেনাপতি বা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তক। দেশকে স্বনির্ভর করতে তিনি প্রবর্তন করেন ‘১৯ দফা কর্মসূচি’। তার নেতৃত্বে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘খাল কাটা কর্মসূচি’, যা কৃষি বিপ্লবে এক অনন্য নজির স্থাপন করে। তিনি কলকারখানা সচল করেন, রপ্তানিমুখী অর্থনীতি চালু করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানোর মাধ্যমে রেমিট্যান্সের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
আজকের বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারের যে মজবুত ভিত্তি, তার কারিগর ছিলেন শহীদ জিয়া। আঞ্চলিক সহযোগিতার লক্ষ্যে তার হাত ধরেই গঠিত হয়েছিল ‘সার্ক’, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়।
জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সাধারণ এবং সৎ। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি এক বিলাসহীন জীবনযাপন করতেন। তার ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জির গল্প আজও বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, "ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড়।" তার দেশপ্রেমের মূল ভিত্তি ছিল জনগণের ক্ষমতায়ন।
তিনি বলতেন, "জনগণের নেতৃত্ব দিতে চান, আপনাকে জনগণের মধ্যে যেতে হবে। সেখানে তাদের মধ্যে থেকে কাজের মাধ্যমে রাজনীতি করে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে হবে।" খালকাটা কর্মসূচির জন্য তিনি গ্রামে-গঞ্জে মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়েছেন। গ্রাম সরকার গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, "বাংলাদেশের জনগণ কখনো অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না।"
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল বিপদগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন এই মহান নেতা। তার শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে কান্নার রোল পড়ে যায়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম শোক সমাবেশ। কোটি মানুষের সেই অশ্রুসিক্ত বিদায় প্রমাণ করেছিল, জিয়াউর রহমান কোনো দলের নয়, বরং তিনি ছিলেন কোটি মানুষের প্রাণের নেতা।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শহীদ জিয়ার স্মৃতি মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রতি বছর তার জন্মবার্ষিকী ও শাহাদাৎ বার্ষিকীর কর্মসূচিতে বাধা প্রদান করা হয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের তার মাজারে ফুল দিতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার সম্মুখিন হওয়া ছিল নিয়মিত দৃশ্য।
লুই আই কানের নকশার দোহাই দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে তার মাজার সরিয়ে ফেলার হুমকিও দিয়েছিল বিগত পতিত সরকার। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বারবার এই মাজারকে ‘অবৈধ’ এবং ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে এটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। পাঠ্যপুস্তক থেকে তার অবদানের কথা মুছে ফেলা হয়েছিল, তার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছিল আওয়ামী লীগ, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার বীর উত্তম খেতাবটি বাতিল করারও।
আজকের এই ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তার আদর্শ ও দেশপ্রেম আজও পথ দেখায় বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এবং উন্নয়নের প্রতিটি স্পন্দনে শহীদ জিয়ার নাম মিশে আছে। বর্তমানের এই সংকটময় সময়ে তার প্রদর্শিত পথেই দেশ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।