মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, পৌষ ৩০ ১৪৩২, ২৪ রজব ১৪৪৭

ব্রেকিং

চুয়াডাঙ্গায় সেই অভিযানে যাওয়া সব সেনা সদস্য প্রত্যাহার, তদন্ত কমিটি মোবাইল আমদানিতে শুল্ক কমল, দামি স্মার্টফোনে ৫৫০০ টাকা কমার আশা টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশু: ঢাকায় মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব বাংলাদেশের অবস্থান বদলাতে অনুরোধ আইসিসির, অনড় বিসিবি যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের পদত্যাগের ঘোষণা ‘প্লট দুর্নীতি’: হাসিনা, টিউলিপ, রূপন্তীর মামলার রায় ২ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ এশীয় উচ্চশিক্ষা সম্মেলন শুরু, প্রধান উপদেষ্টার উদ্বোধন কিশোরগঞ্জ-২: রঞ্জন জামায়াতে, ছেলে খেলাফতে, মুক্তিযোদ্ধা ভাই স্বতন্ত্র শাবিতে নির্বাচন হবে? রাতভর বিক্ষোভ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫% শুল্ক চাপালেন ট্রাম্প ট্রাম্প প্রশাসন এখনও ইরানের ওপর হামলার কথা বিবেচনা করছে ভারতে এই প্রথম আফগান দূতাবাসের দায়িত্বে তালেবান কূটনীতিক যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো উপায়ে’ গ্রিনল্যান্ড দখলে নেবে: ট্রাম্প ১১৬ রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ভেনেজুয়েলা সরকার

ইসলাম

আকিদা ইসলামের মৌলিক বিষয়, গৌণ বা খণ্ডিত ইস্যু নয়

 প্রকাশিত: ১৫:১১, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

আকিদা ইসলামের মৌলিক বিষয়, গৌণ বা খণ্ডিত ইস্যু নয়

মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া

দেশের সর্বজনমান্য, সর্বজনশ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরাম শুরু থেকেই একটি বিশেষ কথিত ইসলামি দলের সঙ্গে দহরম-মহরমের বিরোধিতা করে আসছেন। শুধু বাংলাদেশেরই নয় ভারতবর্ষের বিজ্ঞ, দূরদর্শী ইসলামিক স্কলারগণ এ দলের জন্মলগ্ন থেকেই তাদের ভ্রষ্টতা সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করছেন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সময়কাল থেকেই এদের রাজনৈতিক তৎপরতা ধুম্রজালে আচ্ছন্ন। এদের আকিদাগত ভ্রান্তিগুলোও খুবই মারাত্মক। তাই তাদের সঙ্গে হক্কানি উলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা মানে তাদের ভ্রান্তিগুলোকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা; যার পরিণতিতে উম্মাহ মারাত্মকভাবে আকিদাগত বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হবে। আজ বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটছে। 

আকিদার মতো মৌলিক বিষয়কেও এখন অনেকেই গৌণ ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাদের বিচ্যুতিগুলোর আলোচনা করলে সেটাকে খণ্ডিত, স্থুল কিংবা সংকীর্ণ চিন্তা বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এই আশঙ্কাই হকপন্থী বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম শুরু থেকেই করে আসছিলেন। আকিদার মতো মৌলিক বিষয়কে যারা গৌণ কিংবা খণ্ডিত বিষয় বলে হালকা করে উপস্থাপনের হীন চেষ্টা করছেন, তারা হয়তো অভিন্ন আকিদা লালন করেন, কাজের সুবিধার্থে প্রক্সি সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করছেন, যেমন বিগত ফ্যাসিস্টের আমলে গুপ্ত বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছেন; নতুবা ওদের মাশাওয়া ভোগী হয়ে নিমক-হালালি করছেন।

ইসলামের পুরো বিষয়টিই মূলত আকিদাকেন্দ্রিক। শুধু রাষ্ট্র পরিচালনাই ইসলামে মূল বিষয় নয়; ইসলামের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস। এমন কিছু বিষয়ে আকিদায় ত্রুটি থাকলে, আকিদা ভেজাল হলে, মৌলিক ইবাদতগুলোকেও দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত করে দেয়। ক্ষেত্রবিশেষ আকিদাগত ত্রুটির কারণে ফরজ ইবাদত পর্যন্ত কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। মওদুদীবাদের মধ্যে এমন কিছু আকিদাগত ভ্রান্তি বিদ্যমান, যা মানুষের দ্বীনদারি সামগ্রিকভাবে দুর্বল করে দেয়। এই আশঙ্কার কারণেই উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম সব যুগে মওদুদীবাদকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন। কখনো কখনো তাদের সঙ্গে সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিসরে মিশলেও দ্বীনকে মূল বিষয় বানিয়ে ঐক্যবদ্ধ হননি। পাকিস্তান আমলের একটি প্রসঙ্গ কেউ কেউ টেনে আনেন। কিন্তু সেখানে মওদুদী সাহেব কেবলই একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর কোনো একক বা প্রাধান্যশীল প্রভাবও সেখানে কার্যকর ছিল না। সেখানে বিভিন্ন মত ও ধারার প্রভাবশালী আলেম ও চিন্তাবিদরা সম্মিলিতভাবে উপস্থিত ছিলেন। 

কিন্তু বর্তমানে কথিত ইসলামপন্থার নামে যে ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এতে মওদুদীবাদের প্রভাব এবং মওদুদী বলয়ের প্রাধান্যই স্পষ্ট। এ অবস্থায় এসব বিষয়কে খণ্ডিত, স্থুল বা গৌণ বলে উপস্থাপন করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। বরং এর মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ও আকিদাগত গুরুতর ভ্রান্তিগুলো গুরুত্বহীন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। মোটাদাগে বলা যায়, এটি মওদুদীবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুদূরপ্রসারী অপপ্রয়াস বটে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আকিদাগত কারণে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর বহু সংঘাত হয়েছে। শিয়া–সুন্নি দ্বন্দ্ব, খারেজি ও মুতাজিলাদের ফিতনা, সবই আকিদাগত বিষয়কে কেন্দ্র করে। এসব দ্বন্দ্ব কেবল একাডেমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনেক সময়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জটিল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো ভ্রান্ত আকিদা লালনকারীরা শাসকগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে; আবার শাসকগোষ্ঠী তাদের অবৈধ রাষ্ট্র ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হীন মানসিকতায় কখনো কখনো ভ্রান্ত আকিদাধারীদের জন্ম দিয়েছে; আবার কখনো ন্যায়পরায়ণ শাসককে উৎখাতের অপচেষ্টাও করেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, আকিদার বিষয় কেবল একাডেমিক নয়। রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনা নীতির সাথে সম্পৃক্তও বটে। যদি আকিদা গৌণ বিষয় হতো, তাহলে অতীতে বহু রক্তক্ষয়ী সংঘাতই সংঘটিত হতো না। বর্তমানে ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে যে রক্তের স্রোত বইছে, তাতেও আকিদাগত ভিন্নতা মুখ্য ভূমিকা রাখছে। তাই বলা যায় আকিদাগত বিরোধ এমন এক শক্তিশালী বিষয়, যা রাষ্ট্রের কাঠামো ও ভৌগলিক সীমানাও পরিবর্তন করে দিতে পারে।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ তাদের শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য আকিদাভিত্তিক বিভিন্ন ফেরকার জন্ম দিয়েছে। এসব ফেরকা আকিদাগত বিরোধ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। বিকৃত আকিদাকে তারা পৃষ্ঠপোষকতা ও পেট্রোনাইজ করেছে, আর সেই গোষ্ঠীগুলো ওই আকিদা প্রচারের পাশাপাশি ইংরেজ তোষণ নীতি অবলম্বন করে গেছে। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার অপপ্রয়াসে ভ্রান্ত আকিদার জন্ম দেয়া হয়েছে কিংবা জন্ম নেয়া ভ্রান্ত আকিদাধারীদের হেলদি করা হয়েছে। 

আজ মওদুদীবাদের আকিদাগত বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলাকে খণ্ডিত ও স্থূল দৃষ্টিভঙ্গি বলে প্রচার করা হচ্ছে। ঠিক এই পরিস্থিতির আশঙ্কাতেই উলামায়ে কেরাম শুরু থেকেই মওদুদীবাদের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করেছেন এবং তথাকথিত ঐক্যের বিরোধিতা করে এসেছেন। কখনো ইসলামপন্থীদের এক বাক্সে আনার কথা বলা হচ্ছে, কখনো রাজনৈতিক জোটের নামে বিষয়টি ধোঁয়াটে করা হচ্ছে। শুভংকরের ফাঁকির মতো সুবিধাবাদী এসব কথাবার্তা মূল সমস্যাকে আড়াল করার অপচেষ্টা মাত্র।

অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ইসলাম কায়েম করার দাবি করা কথিত ইসলামি দলটির আমিরের মুখ থেকে সম্প্রতি ইসলামের ফরজ বিধান পর্দা সম্পর্কে চরম অবজ্ঞাপূর্ণ ও আপত্তিকর বক্তব্য শোনা গেছে। ইসলাম কায়েমের দাবিদার কোনো দলের নেতৃত্ব এমন বক্তব্য দিতে পারে না। ফরজ ও আবশ্যিক বিধানের ক্ষেত্রেও তারা অন্যদের ভাষায় কথা বলে, শিথিলতা প্রদর্শন করে। প্রশ্ন হলো এ কেমন ইসলাম? আবার এসব বিষয়ে কথা বললেই বলা হয়, এগুলো নাকি খণ্ডিত ও গৌণ বিষয়! আসলে এসব অবস্থান মওদুদীবাদের আকিদাগত বিচ্যুতিকে আড়াল করে তাকে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য করে তোলারই নীলনকশা। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমিন।